চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারীতে জাহাজভাঙা কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে নিহত ৯ শ্রমিকের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল থেকে স্বজনরা একে একে মরদেহগুলো বুঝে নেন।
এর আগে শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে একটি স্ক্র্যাপ জাহাজের ট্যাংক থেকে গ্যাস লিকেজের ঘটনা ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়লে সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন। পরে আহতদের চমেক হাসপাতালসহ নগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়।
স্থানীয় সূত্র ও হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসের বিষক্রিয়ায় ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ছয়জন মারা যান। এ ঘটনায় ১০ জনের বেশি শ্রমিক আহত হয়েছেন। উদ্ধার কাজে ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যরাও অংশ নেন।
নিহতদের মধ্যে সীতাকুণ্ড ও আশপাশের এলাকার পাশাপাশি পাবনা ও গাইবান্ধার শ্রমিকও রয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুই ভাই মোহাম্মদ মনসুর ও মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন, মোহাম্মদ আব্দুল আলীম সুজন, মোহাম্মদ রানা মিয়া, হাবিবুর রহমান, পলাশ দাশ, সানি দাশ, মোহাম্মদ খোকন মিয়া ও মতিউর রহমানের নাম জানা গেছে।
চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জনের তথ্য অনুযায়ী, নিহত ৯ জনের মধ্যে একজনের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাকি আটজনের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্ক্র্যাপ জাহাজের ভেতর থেকে বিষাক্ত গ্যাস লিক হয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় শ্রমিকরা আক্রান্ত হন। স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, দুর্ঘটনার সময় জাহাজটিতে প্রায় ৩০ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন।
কারখানা কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, শুক্রবার ইয়ার্ড বন্ধ থাকার কথা থাকলেও সকালে জাহাজের একটি ট্যাংকে লিকেজের ঘটনা ঘটে। তবে নিহত শ্রমিকদের স্বজনদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, ছুটির দিনেও শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছিল।
৯ সদস্যের তদন্ত কমিটি
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৯ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে আহ্বায়ক এবং সীতাকুণ্ডের সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) সদস্যসচিব করা হয়েছে। কমিটিতে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে।
তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনার কারণ, কারখানার নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং জাহাজটি কাটার আগে যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখবে।
এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি বলে জানা গেছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে। শিপইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের কারও গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি নিহত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকে মালিকপক্ষের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, গ্যাস শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং জাহাজের ট্যাংক গ্যাসমুক্ত করার প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না—তদন্তে এসব বিষয় গুরুত্ব পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
নয় শ্রমিকের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের দাবি, কর্মক্ষেত্রে যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল। এখন তাদের প্রত্যাশা, তদন্তে প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন:







