চট্টগ্রাম বিভাগের আটটি কারাগারে বর্তমানে ১৯৮ জন বিদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৬৮ জন হাজতি এবং ৩০ জন সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি। কারা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এসব বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে মাদকসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধে মামলা রয়েছে। বিশেষ করে মিয়ানমারের নাগরিকদের বড় একটি অংশ মাদক মামলার আসামি।
তবে ১৯৮ জনের সবাই একই ধরনের অপরাধে কারাগারে নেই। কারও বিরুদ্ধে মাদক পাচার বা বহনের অভিযোগ, কেউ অনলাইনভিত্তিক প্রতারণার মামলায় বিচারাধীন, আবার কারও বিরুদ্ধে অন্যান্য ফৌজদারি অভিযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের আটটি কারাগারে বিদেশি বন্দিদের সংখ্যা হলো—
-
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার: ৮৩ জন, যার মধ্যে ১৩ জন কয়েদি
-
কক্সবাজার কারাগার: ৬১ জন
-
বান্দরবান কারাগার: ৪৫ জন
-
ফেনী-১ কারাগার: ৩ জন
-
কুমিল্লা কারাগার: ২ জন
-
রাঙামাটি কারাগার: ২ জন
-
ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগার: ১ জন
-
নোয়াখালী কারাগার: ১ জন
সব মিলিয়ে সংখ্যাটি দাঁড়ায় ১৯৮ জন।
কারা বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বন্দিদের মধ্যে মিয়ানমার, চীন, নাইজেরিয়া, লাওস, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। এর মধ্যে মিয়ানমারের নাগরিকদের একটি বড় অংশ মাদক মামলায় বন্দি বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শক মো. ছগির মিয়া।
চট্টগ্রাম বিভাগের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্ত যোগাযোগ এবং কক্সবাজার-টেকনাফ অঞ্চলের মাদক পাচারের বিষয়টি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি বন্দিদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মাদকসংক্রান্ত মামলায় আটক রয়েছেন। বিশেষ করে ইয়াবা ও কোকেন পাচারের ঘটনায় বিদেশি নাগরিকদের জড়িত থাকার অভিযোগে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে মামলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ কেন্দ্র। ফলে আন্তর্জাতিক যাতায়াতের সুযোগকে ব্যবহার করে মাদক পাচারের চেষ্টা হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে বিদেশি নাগরিকদের নামও উঠে আসতে পারে।
চট্টগ্রামে বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে মাদক মামলার একটি আলোচিত ঘটনা কোকেন পাচারসংক্রান্ত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক বিদেশি নারীর কাছে থাকা একটি কম্পিউটার ইউপিএসের ভেতর থেকে কোকেন উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পতেঙ্গা থানায় মামলা হয় এবং ওই নারী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
পরে ওই চালান তদারকিতে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই নাইজেরীয় নাগরিককেও গ্রেপ্তার করা হয়। তারা ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্লাবে খেলতেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশের অভিযোগ ছিল, ফুটবল খেলার আড়ালে তারা মাদক পাচারে জড়িত ছিলেন।
বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে মাদক ছাড়াও অনলাইনভিত্তিক প্রতারণা ও অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। কারা বিভাগের উদ্ধৃত তথ্যেও বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বিভাগের কারাগারে থাকা বিদেশিদের কেউ মাদক মামলায়, আবার কেউ অনলাইনভিত্তিক প্রতারণাসহ বিভিন্ন মামলায় বিচারাধীন।
কারাগারে থাকা ১৯৮ বিদেশির মধ্যে ১৬৮ জন হাজতি। অর্থাৎ তাদের মামলার বিচারপ্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের দোষী হিসেবে চূড়ান্তভাবে গণ্য করা যায় না।
অন্যদিকে ৩০ জন কয়েদি আদালতের রায়ে সাজাপ্রাপ্ত। তাদের ক্ষেত্রে আদালতের রায়ের ভিত্তিতে কারাদণ্ড কার্যকর হচ্ছে।
বিদেশি বন্দিদের বাংলাদেশে প্রবেশের পথ ও বৈধতার বিষয়টিও আলাদা করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। কেউ বৈধভাবে বাংলাদেশে এসে পরবর্তীতে অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে থাকতে পারেন। আবার কেউ সীমান্তপথে অবৈধভাবে প্রবেশ বা অন্য কোনো আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক হতে পারেন।
চট্টগ্রাম বিভাগের কারা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বন্দিদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলার ধরনও এক নয়। তাই প্রত্যেকের বাংলাদেশে প্রবেশের কারণ বা বৈধতার অবস্থা একই—এমন কোনো তথ্য নেই।
সংখ্যার দিক থেকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ৮৩ জন বিদেশি বন্দি রয়েছেন। এরপর কক্সবাজার কারাগারে ৬১ জন এবং বান্দরবান কারাগারে ৪৫ জন। এই তিন কারাগারেই মোট ১৮৯ জন বিদেশি বন্দি রয়েছেন—অর্থাৎ বিভাগের মোট বিদেশি বন্দির প্রায় পুরোটাই এই তিন কারাগারে।
বিশেষ করে কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় মিয়ানমারসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর নাগরিকদের সংশ্লিষ্ট মামলার বিষয়টি এখানে বেশি দৃশ্যমান।
চট্টগ্রাম বিভাগ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সমুদ্রবন্দর, বিমান যোগাযোগ এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। এই অঞ্চলের কারাগারগুলোতে ১৬৮ জন বিচারাধীনসহ মোট ১৯৮ বিদেশি নাগরিকের উপস্থিতি সীমান্ত অপরাধ, মাদক পাচার ও আন্তদেশীয় অপরাধের বিভিন্ন দিক সামনে নিয়ে এসেছে।
আরও পড়ুন:







