বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় এখনো মামলা করেনি তার পরিবার। তবে ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে আন্তরিক সহযোগিতা চেয়েছেন তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম।
মামলা না করার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেছেন, মামলা করা মানেই আদালতে দৌড়াদৌড়িসহ নানা ধরনের ঝামেলায় জড়ানো। পরিবার আপাতত এসব ঝামেলায় যেতে চায় না। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ইতোমধ্যে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করছে বলে তাঁর বিশ্বাস। তাই মামলা করা না করার বিষয়টিকে বড় করে না দেখে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নিজস্ব আইনে তদন্ত করে প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তাহসিফের বাবা।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা করা হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে কে এম এনায়েতুল করিম বলেন, বিষয়টি নিয়ে পরিবার এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। পারিবারিকভাবে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, মামলা করার ক্ষেত্রে আদালতে যাওয়া, বিভিন্ন ধরনের আইনি প্রক্রিয়া ও দৌড়াদৌড়ির বিষয় রয়েছে। এসব ঝামেলায় কে জড়াতে চায়? যেখানে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ইতোমধ্যে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে, সেখানে সরকার নিজস্ব দায়িত্ব ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটনার তদন্ত করবে বলে তিনি আশা করেন।
তাঁর ভাষ্য, থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ করা হলো কি না, সেটির ওপর গুরুত্ব না দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত হবে ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে তদন্তের অংশ হিসেবে তাঁর সঙ্গে সর্বশেষ সময় কাটানো বন্ধু দীপের বক্তব্য সামনে এসেছে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের কাছে দীপ দাবি করেছেন, তাঁরা রাতে টঙ্গীর একটি এলাকায় যাওয়ার পর তুরাগ নদের পাড়ে যান। একপর্যায়ে তাহসিফ নিখোঁজ হয়ে যান।
এ বিষয়ে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন—এমন বক্তব্যের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তাঁর বাবা।
তিনি বলেন, একজন ডিফেন্স অফিসার পুলিশের ধাওয়ায় দৌড় দেবেন, এটি হাস্যকর বক্তব্য। তাঁর ছেলে একজন প্রশিক্ষিত পাইলট ছিলেন এবং সাঁতারের ওপরও প্রশিক্ষণ ও সনদ ছিল।
তাহসিফের বাবার বক্তব্য, ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান না করে কোনো অনুমানকে সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
তাহসিফের মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে তাঁর জুনিয়র বন্ধু হিসেবে পরিচিত শাহরিয়ার রেজা দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ হওয়ার আগে তাহসিফের সঙ্গে প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় কাটিয়েছিলেন দীপ। ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে তাহসিফের বাসার সামনে তাঁদের দেখা হওয়ার বিষয়টি সিসিটিভি ফুটেজেও পাওয়া গেছে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, দীপের ফোন পাওয়ার পরই বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। এরপর তিনি আর বাসায় ফেরেননি।
দীপের দেওয়া বক্তব্য ও ঘটনার অন্যান্য তথ্য যাচাই করে দেখছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। তবে তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় দীপের সংশ্লিষ্টতা এখনো প্রমাণিত হয়নি।
তদন্তে নতুন সূত্র হিসেবে সামনে এসেছে তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল। নিখোঁজ হওয়ার পর মোটরসাইকেলটির কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকালে পিবিআইয়ের একটি দল গাজীপুরের টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকার হোন্ডা গলি থেকে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে ঘটনার রাতে তাহসিফ ও দীপের সর্বশেষ অবস্থান টঙ্গীর ওই এলাকায় শনাক্ত করা হয়। পরে দীপের দেখানো স্থান থেকে একটি দোকানের সামনে নম্বরপ্লেটবিহীন অবস্থায় মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়।
দীপ মোটরসাইকেলটি তাহসিফের বলে শনাক্ত করেছেন। তবে তাঁরা কেন গভীর রাতে ওই এলাকায় গিয়েছিলেন এবং সেখানে অন্য কারও সঙ্গে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পিবিআই।
গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে রাজধানীর উত্তরখান এলাকার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ।
২৮ বছর বয়সী তাহসিফ উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতেন। নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা তাঁর খোঁজ করছিলেন। পরে নদে মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা তাঁর পরিচয় শনাক্ত করেন।
২৯ অক্টোবর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ময়নাতদন্তের জন্য শরীরের কিছু নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফল পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক জানিয়েছেন।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যদিকে তদন্ত কর্মকর্তারা তাঁর নিখোঁজ হওয়ার আগে ও পরের ঘটনাপ্রবাহ, বন্ধু দীপের বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলের সূত্র ধরে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন।
এখন পর্যন্ত তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এটি হত্যা, দুর্ঘটনা নাকি অন্য কোনো কারণে ঘটেছে, তা তদন্ত ও ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করছে।
পরিবারের প্রত্যাশা, মামলা করা হোক বা না হোক, সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আনবে এবং জড়িত কেউ থাকলে তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসবে।
আরও পড়ুন:







