News Ticker
221.png

বারে মদ্যপান, প্রেমিকার সঙ্গে বিরোধের পর হেরোইন খুঁজতে টঙ্গীতে যান তাহসিফ

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১ নভেম্বর, ২০২৬ ২২:৪৫

শেয়ার

শেয়ার

বারে মদ্যপান, প্রেমিকার সঙ্গে বিরোধের পর হেরোইন খুঁজতে টঙ্গীতে যান তাহসিফ
ছবি: সংগৃহীত

বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুরহস্য তদন্তে তাঁর জীবনের শেষ রাতের নানা তথ্য সামনে আসছে। প্রেমিকার সঙ্গে বিরোধ, বারে মদ্যপান এবং টঙ্গীতে হেরোইন কিনতে গিয়ে পুলিশের ধাওয়ার মুখে পড়ার বিস্তারিত জানিয়েছেন তাঁর বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ। রিমান্ডে থাকা দীপের বক্তব্য ও ফরেনসিক বিভাগের প্রাথমিক অনুসন্ধানে মৃত্যুর বিভিন্ন দিক উঠে এলেও তাহসিফ কীভাবে পানিতে পড়ে মারা গেলেন, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

জিজ্ঞাসাবাদে দীপ জানান, গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৮ মিনিটে তাহসিফ, দিশা ও তিনি উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের নেস্ট বারে যান। কয়েক দিন আগে দিশা অন্য এক যুবকের বাসায় ইয়াবা সেবন এবং তাঁর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন বলে জানতে পারেন তাহসিফ। বিষয়টি নিয়ে মন খারাপ থাকায় সেদিন দিশাকে নিয়ে বারে যান তিনি।

দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, বারে গিয়ে তাহসিফ বিষণ্ন সংগীত বাজাতে বলেন। পরে তাঁরা মদ্যপান করেন। এ সময় দিশার সঙ্গে অন্য এক যুবকের ইয়াবা সেবন ও তাঁর সঙ্গে রাত কাটানো নিয়ে তাহসিফের ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে তিনি দিশাকে বলেন, ‘তুমি তো ইয়াবা খেয়েছ, আমি এর চেয়েও বড় কিছু খাব। আমি হেরোইন খাব।’

রাত ১২টার দিকে বার থেকে বের হয়ে তাহসিফ দিশাকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে তাঁর বাসায় পৌঁছে দেন। এরপর তাহসিফ ও দীপ নিজ নিজ মোটরসাইকেলে টঙ্গী বাজার বস্তিসংলগ্ন মাঠে যান। দীপ জানান, মাঠে গিয়ে তাহসিফ উচ্চস্বরে হেরোইন চান এবং যত টাকা লাগে দেবেন বলে জানান। পরে স্থানীয় মাদক কারবারিদের কাছ থেকে মাদক কিনে সেবন করেন তিনি।

দীপের দাবি, এ সময় পুলিশের একটি টহল দল সেখানে এলে মাদক কারবারিরা পালিয়ে যান। তিনিও দৌড়ে নদীর পাড়ে গিয়ে ২৯ নম্বর পিলারের পেছনে লুকান। পরে দুই পুলিশ সদস্য তাঁকে ঘিরে ধরেন। তাঁদের কাছে নিজেকে ক্যাপ্টেন তাহসিফের বন্ধু পরিচয় দিয়ে সেখান থেকে বস্তির সরু রাস্তা দিয়ে চলে যান তিনি।

দীপ আরও জানান, পরে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে তাহসিফকে একাধিকবার ফোন করলেও প্রতিবারই বন্ধ পান। তাঁর ধারণা হয়েছিল, তাহসিফ হয়তো কোথাও বসে মাদক সেবন করছেন। পরে তিনি মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন। তবে তাহসিফকে পানিতে পড়তে দেখেননি বলে দাবি করেছেন দীপ।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, দীপকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, মোবাইল ফোন বিশ্লেষণ এবং বারের বিভিন্ন তথ্য যাচাই করা হয়েছে। তাহসিফের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড নয়, দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বলে মনে হচ্ছে। তবে এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। দীপ ও দিশাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

এদিকে তাহসিফ ও দীপের টঙ্গীর মাঠে যাওয়ার একটি ভিডিও ঢাকা পোস্টের হাতে এসেছে। এতে তাহসিফকে বস্তির সরু রাস্তা দিয়ে মাঠের দিকে যেতে এবং দীপকে হেলমেট হাতে তাঁর পেছনে হাঁটতে দেখা যায়। এ সময় তাহসিফকে বলতে শোনা যায়, ‘দীপ, ডোন্ট টক টু মাচ, লেটস ওয়াক।’

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ময়নাতদন্তের সময় তাহসিফের পাকস্থলী, কিডনি, রক্ত ও ভিসেরার নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার নমুনাও সংগ্রহ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফরেনসিক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, মরদেহটি ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পানির নিচে ছিল। প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্ত ও রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ বলা সম্ভব নয়। মাদক বা অন্য কোনো নেশাজাতীয় পদার্থ গ্রহণের বিষয়টিও পরীক্ষায় জানা যেতে পারে।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, বারে মদ্যপান, প্রেমিকার সঙ্গে বিরোধ, টঙ্গীর মাঠে মাদক সেবন এবং পুলিশের উপস্থিতিতে দীপের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাগুলো তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে তাহসিফ কীভাবে পানিতে পড়েছিলেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

উল্লেখ্য, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় দীপের ডাকে উত্তরার বাসা থেকে বের হন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি (২৮)। ওই রাতে মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলে বাসায় ফেরার কথা জানালেও আর ফেরেননি। রাত ১টার দিকে তাঁর ফোন থেকে মায়ের মেসেঞ্জারে ‘রওনা দিসি আসতেছি’ লেখা একটি ভয়েস মেসেজ পাঠানো হয়।

পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে চারটার দিকে তুরাগ নদে মরদেহ ভাসার খবর পেয়ে টঙ্গী নৌপুলিশ রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তা উদ্ধার করে। পরে পকেটে থাকা আইফোনের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত হয়। মরদেহে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে জানায় পুলিশ।

তাহসিফের নিখোঁজ ও মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে নামে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ২৯ অক্টোবর গভীর রাতে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।

প্রথমদিকে দীপ দাবি করেছিলেন, উত্তরার হাউজ বিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান তিনি। পরে টঙ্গীর মাদক স্পটে যাওয়ার কথা স্বীকার করেন। এদিকে ৩০ অক্টোবর দিবাগত রাতে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

৩১ অক্টোবর আদালত দীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রোববার (১ নভেম্বর) ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে নেস্ট বারে যাওয়া তরুণী জারিকা তাসনিম দিশাকেও কাফরুলের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে নৌপুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধেও সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে।

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, সিসিটিভি ফুটেজ ও তাহসিফের ফোনের কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দিশার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এবং ঘটনার রাতে একসঙ্গে বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। বর্তমানে দীপ ও দিশাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এতে কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থা।

ChannelNRB Footer