তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় নতুন অভিযোগ তুলেছেন শ্রমিক নেতারা। তাদের দাবি, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিতে চলমান আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে পরিকল্পিতভাবে বহিরাগত লোকজনকে ভাড়ায় নিয়োগ করা হয়েছে। এসব ব্যক্তি প্রকৃত শ্রমিকদের আন্দোলনের সঙ্গে মিশে বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন।
সোমবার (২ নভেম্বর) রাজধানীতে ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধিদের আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন শ্রমিক নেতারা। একই সঙ্গে আন্দোলনে গ্রেপ্তার শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের মুক্তি, হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার এবং শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের দাবি জানান তারা।
শ্রমিক প্রতিনিধিরা জানান, তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের মজুরি বৈষম্য, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং চাকরির অনিশ্চয়তা থেকে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। এসব সমস্যার সমাধানে শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার রয়েছে। তবে আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে যারা সহিংসতা ও ভাঙচুর চালাচ্ছে, তাদের সঙ্গে প্রকৃত শ্রমিকদের এক করে দেখা ঠিক হবে না।
শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের সুযোগ নিয়ে একটি পক্ষ আন্দোলনে বহিরাগতদের যুক্ত করছে। তাদের উদ্দেশ্য শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে আড়াল করে সহিংস পরিস্থিতি তৈরি করা।
সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ও শ্রমিকনেতা নাজমা আক্তার বলেন, মিরপুরে আন্দোলনের সঙ্গে হোপ মার্কেটের আন্দোলনরত ফুটপাতের ব্যবসায়ীরাও যুক্ত হয়েছেন। অন্যদিকে গাজীপুরে শ্রমিকদের পাশাপাশি স্থানীয় কিছু মানুষও আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিক আন্দোলনের নামে বিভিন্ন স্থানে বহিরাগত এবং বিভিন্নভাবে বঞ্চিত ও সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিরা জড়ো হয়ে ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন। কোথাও কারখানা বন্ধ থাকা কিংবা বেতন না পাওয়ার অজুহাতে কারখানায় ঢুকে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটছে।
শ্রমিক নেতাদের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রকৃত শ্রমিকদের স্বার্থের পরিপন্থী। কারণ কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হলে উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের কর্মসংস্থানই ঝুঁকির মুখে পড়ে।
তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো মাসিক ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি। বর্তমানে প্রচলিত ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশপাশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বিক্ষোভ চলছে।
শ্রমিকদের অভিযোগ, বর্তমান বাজারদরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় মেটাতে প্রচলিত মজুরি যথেষ্ট নয়। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা জরুরি।
এ ছাড়া অন্যায্যভাবে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ, চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং শ্রমিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছেন প্রতিনিধিরা।
চলমান আন্দোলন ঘিরে বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শ্রমিক প্রতিনিধিরা। তাদের দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সঙ্গে আইনসম্মত আচরণ নিশ্চিত করতে হবে এবং কোনো ধরনের নির্যাতন করা যাবে না।
ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আখতার গ্রেপ্তার শ্রমিক নেতাদের দ্রুত মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, গ্রেপ্তার নেতাদের যেন নির্যাতন করা না হয় এবং আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার এবং অযথা প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধের আহ্বান জানান তারা।
সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিক প্রতিনিধিরা জানান, চলমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে তারা শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার আন্দোলনের তীব্রতা আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে।
বাবুল আখতার জানান, মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) থেকে আন্দোলন প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে বলে তারা আশা করছেন। শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তবে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার আদায়ের দাবি থেকে তারা সরে আসবেন না। নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, বাজার পরিস্থিতি ও বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন প্রতিনিধিরা।
নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। এ বোর্ডের মাধ্যমে মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের মতামতের ভিত্তিতে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।
শ্রমিক নেতারা আশা করছেন, আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত আসবে এবং জানুয়ারির মধ্যেই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন:







