শ্রীলঙ্কায় একাধিক কারাগারে বন্দীদের মধ্যে দাঙ্গা ও সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত তিনজন নিহত এবং ২৩ জন আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানী কলম্বোর একটি কারাগারে বন্দিদের পালানোর চেষ্টাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের পর শুক্রবার আরও একটি কারাগারে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি কারাগারে সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
শ্রীলঙ্কার জননিরাপত্তামন্ত্রী আনন্দ উইজেপালা জানিয়েছেন, ৬ আগস্ট রাতে কলম্বোর ম্যাগাজিন কারাগারে প্রায় ৪০ জন বন্দি সেল ভেঙে বের হওয়ার চেষ্টা করলে কারারক্ষীদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। এতে একজন বন্দি নিহত এবং ১০ জন আহত হন।
এরপর শুক্রবার রাজধানী কলম্বো থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কুরুভিটা কারাগারে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়। সেখানে বন্দিদের সঙ্গে নিরাপত্তাকর্মীদের সংঘর্ষে আরও দুই বন্দি নিহত হন। আহত হন ১৩ জন।
শুক্রবার সকালে কুরুভিটা কারাগারে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সংঘর্ষ থামাতে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। নিহত ও আহতদের বেশিরভাগই বন্দি বলে সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
প্রাথমিকভাবে এসব ঘটনার পেছনে বন্দিদের বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী মাদকচক্রের দ্বন্দ্বের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে পুরো পরিস্থিতি ও সংঘর্ষের সুনির্দিষ্ট কারণ খতিয়ে দেখছে কর্তৃপক্ষ।
একই সময়ে শ্রীলঙ্কার পাল্লানসেনা কারেকশনাল সেন্টারেও বন্দিদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে পুলিশ ও বিশেষ বাহিনী মোতায়েন করা হয় এবং কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। তবে ওই ঘটনায় হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া দেশটির বিভিন্ন কারাগারে সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রাজধানীর ম্যাগাজিন কারাগারসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারাগারের বাইরে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।
শ্রীলঙ্কার কারাগার ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত বন্দির চাপ রয়েছে। দেশটির কারাগারগুলোতে বর্তমানে ৩৯ হাজারের বেশি বন্দি রয়েছে, যেখানে নির্ধারিত ধারণক্ষমতা প্রায় ১০ হাজারের মতো। অর্থাৎ কারাগারগুলো তাদের সক্ষমতার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বন্দি ধারণ করছে।
মানবাধিকারকর্মী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মাদকবিরোধী কঠোর আইন, দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া এবং পর্যাপ্ত পুনর্বাসন ব্যবস্থার অভাব কারাগারে বন্দির সংখ্যা বাড়িয়ে তুলছে। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে বন্দিদের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঝুঁকিও বাড়ছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর আগে জুলাই মাসেও শ্রীলঙ্কার নেগোম্বো কারাগারে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়েছিল। দুই দিন ধরে চলা ওই সহিংসতায় ১০ জন কারা কর্মকর্তা ও ২০ জন বন্দি নিহত হন। এরপর গত সপ্তাহে মাহারা কারাগারে আরেক দফা দাঙ্গায় একজন বন্দি নিহত এবং ছয়জন আহত হন।
এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে একাধিক কারাগারে প্রাণঘাতী সংঘর্ষের ঘটনায় দেশটির কারাগার ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সামরিক ও পুলিশ সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি কারাগারগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করছে সরকার।
সাম্প্রতিক ধারাবাহিক সহিংসতার পর শ্রীলঙ্কা সরকার কারাগারগুলোতে নিরাপত্তা বাড়িয়েছে। বন্দিদের পালানোর চেষ্টা এবং সংঘর্ষ যাতে অন্য কারাগারে ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অতিরিক্ত বন্দির চাপ সামলানো এবং কারাগারের ভেতরে বিভিন্ন অপরাধী ও মাদকচক্রের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা। একই সঙ্গে বন্দিদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করে কারাগারের অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ করা সম্ভব নয়। অতিরিক্ত বন্দির চাপ কমানো, বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত করা এবং মাদকাসক্ত বন্দিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা জরুরি। অন্যথায় কারাগারগুলোতে নতুন করে সংঘর্ষের ঝুঁকি থেকেই যাবে।
সূত্র: এপি নিউজ
আরও পড়ুন:







