বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট এভারেস্টে প্রায় তিন দশক ধরে পড়ে থাকা সবচেয়ে পরিচিত মৃতদেহগুলোর একটি এবার উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। পর্বতারোহীদের কাছে ‘গ্রিন বুটস’ নামে পরিচিত এই মৃতদেহটি এভারেস্টের উত্তর-পূর্ব রিজে প্রায় ৮,৫০০ মিটার উচ্চতায় পড়ে রয়েছে।
এভারেস্টের দুর্গম ওই অংশে পড়ে থাকা মৃতদেহটির পায়ে ছিল উজ্জ্বল সবুজ রঙের পর্বতারোহণের বুট। সেই বুটের কারণেই পর্বতারোহীদের কাছে তিনি ‘গ্রিন বুটস’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হতো, মৃতদেহটি ভারতীয় পর্বতারোহী ত্সেওয়াং পালজোরের। তবে ২০২৬ সালে প্রকাশিত ভারতীয় সরকারি নথি ও ডিএনএ-সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে এখন মৃতদেহটি দর্জে মরুপ (Dorje Morup)-এর বলে শনাক্ত করা হয়েছে।
দর্জে মরুপ ছিলেন ইন্দো-তিব্বত বর্ডার পুলিশ (ITBP)-এর সদস্য। ১৯৯৬ সালের মে মাসে ছয় সদস্যের একটি ITBP দল এভারেস্ট অভিযানে যায়।
সেই সময় ভয়াবহ তুষারঝড়ের মধ্যে দলের তিন সদস্য—দর্জে মরুপ, ত্সেওয়াং পালজোর এবং ত্সেওয়াং সামনলা—ফিরে আসতে পারেননি। ওই বছরের এভারেস্ট বিপর্যয়টি পর্বতারোহণের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
মরুপের মরদেহ পরে এভারেস্টের উত্তর-পূর্ব রিজের একটি পাথুরে আশ্রয়স্থলে পাওয়া যায়। প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে দেহটি দীর্ঘদিন বরফে সংরক্ষিত অবস্থায় ছিল এবং পরবর্তী বহু বছর সেটি আরোহীদের জন্য একটি পরিচিত চিহ্নে পরিণত হয়।
এভারেস্টের ৮,০০০ মিটারের ওপরের অঞ্চলকে বলা হয় ‘ডেথ জোন’। সেখানে বাতাসে অক্সিজেন অত্যন্ত কম, তাপমাত্রা ভয়াবহভাবে নিচে নেমে যায় এবং ঝড়, তুষারধস ও বরফধসের ঝুঁকি থাকে।
এই উচ্চতায় একটি মৃতদেহ নামিয়ে আনা সাধারণ উদ্ধারকাজের মতো নয়। মরদেহটি দীর্ঘদিন বরফে জমে থাকায় সেটি অত্যন্ত ভারী ও শক্ত হয়ে যেতে পারে। ফলে কয়েকজন অভিজ্ঞ পর্বতারোহীকে একসঙ্গে কাজ করে দেহটি ধীরে ধীরে নিচে নামাতে হবে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো—মরদেহটি এভারেস্টের তিব্বত অংশে, অর্থাৎ চীনের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায়। তাই উদ্ধার অভিযানের জন্য চীনা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও প্রয়োজনীয় সমন্বয় দরকার।
ITBP ইতিমধ্যে উচ্চ-উচ্চতার উদ্ধারকাজে দক্ষ একটি বিশেষায়িত সংস্থা খুঁজতে টেন্ডার দিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিজ্ঞ শেরপাদের একটি দল প্রায় ৮,০০০ মিটারের ওপরে উঠে মরদেহটি উদ্ধার করে নিচে নিয়ে আসবে। এরপর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে মরদেহ ভারতে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
হেলিকপ্টারের মাধ্যমে মরদেহ সরিয়ে আনার সুযোগও অত্যন্ত সীমিত। এত উচ্চতায় হেলিকপ্টার পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন; ফলে মূল কাজটি করতে হবে মানুষকেই।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য ২০২৬ সালের পর্বতারোহণ মৌসুমের মধ্যেই অভিযানটি সম্পন্ন করা। তবে আবহাওয়া, চীনা অনুমোদন, বরফের অবস্থা এবং নিরাপত্তার ওপর সময়সূচি নির্ভর করবে।
এটি শুধু একটি মরদেহ উদ্ধারের অভিযান নয়। প্রায় ৩০ বছর ধরে মরুপের পরিবার জানত না তাঁর শেষ পরিণতি কীভাবে সম্মানের সঙ্গে সম্পন্ন হবে। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে পারলে পরিবার তাঁর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক রীতি অনুযায়ী শেষকৃত্য সম্পন্ন করার সুযোগ পাবে।
একই সঙ্গে এটি এভারেস্টে পড়ে থাকা শত শত মৃতদেহের বিষয়টিও সামনে এনেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এভারেস্টে ২০০-এর বেশি মৃতদেহ এখনও পড়ে থাকার কথা বলা হয়েছে। প্রচণ্ড দুর্গমতা ও বিপদের কারণে অধিকাংশ মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
এভারেস্টের উত্তর-পূর্ব রুটে ওঠা পর্বতারোহীদের কাছে ‘গ্রিন বুটস’ একসময় কার্যত একটি ল্যান্ডমার্ক হয়ে উঠেছিল। চূড়ার দিকে যাওয়ার পথে তাঁরা ওই জায়গাটি দেখে নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পেতেন।
তাই ‘গ্রিন বুটস’ শুধু একজন মৃত পর্বতারোহীর পরিচয় নয়—এটি এভারেস্টের চরম বিপজ্জনক ‘ডেথ জোন’-এর একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে।
প্রায় তিন দশক ধরে বরফের মধ্যে পড়ে থাকা সেই দেহকে এবার সম্মানের সঙ্গে পাহাড় থেকে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে ভারত। সফল হলে এটি হবে একটি অত্যন্ত কঠিন ও প্রতীকী উদ্ধার অভিযান, যা একই সঙ্গে দর্জে মরুপের পরিবারকে বহু বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে পারে।
সূত্র: এপি নিউজ
আরও পড়ুন:







