যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতের অবসানে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে ইরান। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান চলমান সংকটের অবসানে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগের কথা বলেছেন। তবে চুক্তিতে পৌঁছাতে ইরানের পক্ষ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত সামনে এসেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা, নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এখনও বড় মতপার্থক্য রয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, সংঘাতের অবসানে সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য বর্তমান সময়কে কাজে লাগানো যেতে পারে। ইরানের অবস্থান হলো—দেশটি আলোচনায় প্রস্তুত, তবে এমন কোনো চুক্তি তারা মেনে নেবে না যা তাদের সার্বভৌমত্ব বা জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়।
তেহরান একই সঙ্গে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী বলে মনে করছে। ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তারা যুদ্ধ বন্ধের আলোচনাকে আত্মসমর্পণ হিসেবে নয়, বরং পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে একটি রাজনৈতিক সমাধান হিসেবে দেখতে চায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য সমঝোতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখন হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে পরিচিত এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়।
ইরান ও ওমানের মধ্যে প্রণালির নৌ চলাচল ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে তেহরানের বক্তব্য, শুধু ওমানের সঙ্গে চুক্তি হলেই হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে না। এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকেও বেশ কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে।
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে।
ইরানের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
-
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ও হুমকি বন্ধ করা;
-
ইরানের আশপাশ থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার;
-
যুদ্ধের কারণে ইরানের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া;
-
ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার;
-
বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ ছাড় করা;
-
ইরানের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক বিষয়ে মার্কিন হস্তক্ষেপ বন্ধ করা।
তেহরানের এই দাবিগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র কতটা গ্রহণ করবে, সেটিই এখন আলোচনার অন্যতম বড় প্রশ্ন।
অন্যদিকে ওয়াশিংটনও হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে ইরানের কাছ থেকে কিছু নিশ্চয়তা চায়। যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ শিথিল বা প্রত্যাহারের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে এর বিনিময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচলের নিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন চায় তারা।
ফলে উভয় পক্ষই আলোচনার বিষয়ে আগ্রহ দেখালেও শর্তের জায়গায় এখনও বড় ব্যবধান রয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি উত্তেজনা কমাতে আঞ্চলিক দেশগুলোও মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ওমান হরমুজ প্রণালি নিয়ে সমঝোতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, ওমানের সঙ্গে আলোচনায় বিষয়গুলো চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং বিশেষ করে জাহাজ চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট ট্রানজিট রুট নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে প্রণালি পুরোপুরি খুলতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও কিছু বিষয় নিষ্পত্তি করতে হবে।
হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ বা সীমিত থাকলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, তেলের দাম, জাহাজ চলাচল এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার দিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নজর রয়েছে। একটি চুক্তি হলে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও চাপ কিছুটা কমতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা
আরও পড়ুন:







