আফগানিস্তানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় শুরু হয়েছে সোনা উত্তোলনের ব্যাপক তৎপরতা। বিশেষ করে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বাদাখশান প্রদেশে দিন-রাত চলছে সোনা অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজ। পাহাড় কেটে, নদী ও পাথুরে ভূমি থেকে সোনার কণা সংগ্রহে ব্যবহার করা হচ্ছে খননযন্ত্র। এতে একদিকে স্থানীয় মানুষের জীবিকার নতুন সুযোগ তৈরি হলেও অন্যদিকে পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
বাদাখশানের দুর্গম এলাকায় একসময় যেখানে গ্রামবাসী ও তাদের গবাদিপশু বিচরণ করত, সেখানে এখন দেখা যাচ্ছে একের পর এক খননযন্ত্র। সোনা পাওয়ার আশায় পাহাড় ও নদীর আশপাশে ব্যাপকভাবে মাটি খনন করা হচ্ছে।
স্থানীয় পর্যায়ে ছোট আকারের খনন দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সোনার প্রতি আগ্রহ এবং উত্তোলনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে কিছু এলাকায় খনিকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতিতেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
দীর্ঘ অর্থনৈতিক সংকট, কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ এবং দারিদ্র্যের মধ্যে আফগানিস্তানের বহু মানুষ জীবিকার জন্য খনিশিল্পের দিকে ঝুঁকছেন।
সোনা ধোয়া ও ছোট আকারের খনন কার্যক্রমে হাজার হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়েছে বলে আফগান কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্যেও উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারের দাবি, খনিশিল্পের সম্প্রসারণ কর্মসংস্থান ও রাজস্ব বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে কৃষিকাজের পাশাপাশি সোনা উত্তোলন অনেক পরিবারের জন্য অতিরিক্ত আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে।
সোনা উত্তোলনের এই ব্যাপক কর্মকাণ্ডের অন্যতম বড় উদ্বেগ পরিবেশ। পাহাড় কেটে খনি তৈরি, নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং অপরিকল্পিতভাবে মাটি ও পাথর সরানোর ফলে স্থানীয় পরিবেশ ও পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ছোট আকারের সোনা উত্তোলন দীর্ঘমেয়াদে মাটি ও পানিদূষণ তৈরি করতে পারে। বাদাখশানে চলমান সোনার উত্তোলনকে ঘিরে পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আফগানিস্তানে সোনা, তামা, লোহা, কয়লা, লিথিয়ামসহ বিপুল খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা করা গেলে কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় ও সরকারি রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব। তবে দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও অনিয়ন্ত্রিত খনন পরিবেশগত ক্ষতি, দুর্নীতি এবং সংঘাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ফলে আফগানিস্তানে বর্তমান ‘গোল্ড রাশ’ শুধু সোনা পাওয়ার দৌড় নয়; এটি দেশটির অর্থনীতি, স্থানীয় মানুষের জীবিকা এবং পরিবেশ—তিন ক্ষেত্রেই বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সোনার বাজারমূল্য, কর্মসংস্থানের প্রয়োজন এবং সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধির আগ্রহ—সব মিলিয়ে আফগানিস্তানে সোনা উত্তোলনের তৎপরতা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, খনিশিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করতে হলে পরিবেশ সুরক্ষা, শ্রমিক নিরাপত্তা, স্থানীয় জনগণের অধিকার এবং স্বচ্ছ রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
অন্যথায় পাহাড়ের বুক থেকে উঠে আসা এই সোনার সম্পদ আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বদলে নতুন পরিবেশগত ও সামাজিক সংকটের কারণও হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: এএফপি
আরও পড়ুন:







