ইরানের সম্ভাব্য হত্যাচেষ্টা থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিরাপদ রাখতে তুরস্ক থেকে তাকে গোপনে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। নজরদারি এড়াতে ট্রাম্পকে বিমানবন্দরের একটি খাবার সরবরাহকারী ট্রাকে করে একটি ছোট সামরিক বিমানে নেওয়া হয়। এ সময় সাংবাদিক ও হোয়াইট হাউসের কিছু কর্মকর্তাকে বিভ্রান্ত করতে পুরোনো ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’কে ডিকয় বা বিভ্রান্তিকর বিমান হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
ঘটনাটি ঘটে গত জুলাইয়ে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনের পর। সম্প্রতি ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনের মাধ্যমে এই গোপন অভিযানের বিস্তারিত প্রকাশ্যে আসে। পরে অন্যান্য মার্কিন সংবাদমাধ্যমও বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আঙ্কারা বিমানবন্দরে প্রকাশ্যে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল যাতে মনে হয় ট্রাম্প পুরোনো ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এই যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।
সাংবাদিকদের সামনে ট্রাম্পকে ওই বিমানে ওঠার দৃশ্যও দেখানো হয়। কিন্তু সেটি ছিল পুরো নিরাপত্তা পরিকল্পনার একটি অংশ। এরপর গোপনে তাকে বিমানবন্দরের একটি ক্যাটারিং বা খাবার সরবরাহকারী ট্রাকে স্থানান্তর করা হয়। ট্রাকটি তাকে নিয়ে যায় অন্য একটি সামরিক বিমানের কাছে।
এরপর ট্রাম্প একটি C-32A সামরিক বিমানে তুরস্ক ত্যাগ করেন। বিমানটি ছোট হওয়ায় এবং সেটিতে ট্রাম্পের উপস্থিতি গোপন রাখায় তার প্রকৃত যাত্রাপথ সম্পর্কে বিভ্রান্তি বজায় রাখা সম্ভব হয়।
মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইরানের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য হত্যাচেষ্টার হুমকি শনাক্ত করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সেই হুমকির কারণে প্রেসিডেন্টের গতিবিধি ও ব্যবহৃত বিমানের তথ্য গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিশেষ করে ট্রাম্প কোন বিমানে ফিরছেন, কখন বিমান ছাড়বে এবং কোন পথে যাবে—এসব তথ্য সম্ভাব্য হামলাকারীদের হাতে গেলে ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা আশঙ্কা করেছিলেন।
এই অভিযানের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক ছিল—ট্রাম্পের সঙ্গে ভ্রমণরত সাংবাদিকদের একটি বড় অংশও জানতেন না যে প্রেসিডেন্ট প্রকৃতপক্ষে তাদের সঙ্গে একই বিমানে নেই।
পুরোনো ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ বিমানটিকে ট্রাম্পের প্রকৃত বিমান হিসেবে দেখানো হয়। ফলে সাংবাদিক ও কিছু কর্মকর্তা ধারণা করেন, প্রেসিডেন্ট ওই বিমানেই তুরস্ক ছাড়ছেন।
এমনকি ডিকয় বিমানের জানালার শেড নামিয়ে রাখার ব্যবস্থাও করা হয়েছিল, যাতে বাইরে থেকে বিমানের ভেতরের পরিস্থিতি বোঝা না যায়।
গোপন সামরিক বিমানে করে ট্রাম্প তুরস্ক থেকে যুক্তরাজ্যে পৌঁছান। সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে আবার পুরোনো ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এ স্থানান্তর করা হয়।
এর ফলে পরবর্তী যাত্রাপথে বাইরের পর্যবেক্ষকদের কাছে এমন ধারণাই বজায় থাকে যে ট্রাম্প পুরো সময় ওই বিমানেই ছিলেন।
ন্যাটো সম্মেলনের আগে ট্রাম্প কাতারের উপহার দেওয়া নতুন বোয়িং ৭৪৭-৮ বিমানে তুরস্কে পৌঁছেছিলেন। তবে ফেরার সময় তিনি পুরোনো ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছিলেন।
প্রকাশ্য বক্তব্যে ট্রাম্প পুরোনো বিমানটিতে ভ্রমণের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। কিন্তু নিরাপত্তা পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার পর সেটিই শেষ পর্যন্ত একটি বিভ্রান্তিমূলক বা ডিকয় বিমান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ট্রাম্পকে গোপনে তুরস্ক থেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তীব্র উত্তেজনার সময় সামনে এলো। সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি হুমকির কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, হুমকির ধরন ও বিশ্বাসযোগ্যতা বিবেচনা করেই প্রেসিডেন্টের গতিবিধি গোপন রাখার মতো অসাধারণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
প্রেসিডেন্টকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার এই কৌশল সফল হলেও ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে সাংবাদিক ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের না জানিয়ে একটি ডিকয় বিমানে রাখার সিদ্ধান্ত কতটা নিরাপদ ছিল, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করছেন, সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে যদি ডিকয় বিমানটি বিবেচিত হয়ে থাকে, তাহলে সেখানে থাকা সাংবাদিক ও অন্যান্য ব্যক্তিরাও ঝুঁকিতে পড়তে পারতেন।
তবে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কর্মকর্তাদের যুক্তি, বিদ্যমান হুমকির মাত্রা বিবেচনায় প্রেসিডেন্টের প্রকৃত অবস্থান গোপন রাখা প্রয়োজন ছিল।
সূত্র: দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট
আরও পড়ুন:







