News Ticker
221.png

১০০ বছর পর সৌদির মরুভূমিতে ফিরল বিলুপ্তপ্রায় বন্য গাধা ওনাগার

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১ আগস্ট, ২০২৬ ২৩:৪০

শেয়ার

শেয়ার

১০০ বছর পর সৌদির মরুভূমিতে ফিরল বিলুপ্তপ্রায় বন্য গাধা ওনাগার
ছবি: সংগৃহীত

এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর সৌদি আরবের মরুভূমিতে আবারও বন্যভাবে বিচরণ করছে বিরল ওনাগার। এশীয় বন্য গাধা নামে পরিচিত এই প্রাণীটি আরব উপদ্বীপ থেকে একশ বছরেরও বেশি সময় আগে হারিয়ে গিয়েছিল। এখন দেশটির প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান রয়্যাল রিজার্ভে একটি ওনাগার শাবকের জন্মের মধ্য দিয়ে প্রজাতিটির প্রত্যাবর্তন আরও দৃশ্যমান হয়েছে।

সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পুরুষ শাবকটির জন্ম হয় ২০২৫ সালের জুনে। তবে জীবনের প্রথম ১২ মাস সফলভাবে পার করার পর ২০২৬ সালের জুনে তার জন্মের খবর প্রকাশ করা হয়। ওনাগার শাবকদের জীবনের প্রথম বছর অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এক বছর পার হওয়ার বিষয়টিকে সংরক্ষণ কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ওনাগার (Equus hemionus) এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে পাওয়া যায়। এটি ঘোড়ার পরিবারের একটি বন্য প্রাণী এবং গৃহপালিত গাধার তুলনায় আকারে বড় ও বেশি শক্তিশালী।

ঐতিহাসিকভাবে আরব উপদ্বীপেও এই প্রাণীর বিচরণ ছিল। কিন্তু শিকার, আবাসস্থল পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে এটি ওই অঞ্চল থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। সৌদি আরবের মরুভূমিতে ১০০ বছরেরও বেশি সময় পর এ প্রজাতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা দেশটির বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কার্যক্রমের বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সৌদি আরবে ওনাগার পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে জর্ডানের শাওমারি ওয়াইল্ডলাইফ রিজার্ভ থেকে সাতটি পারস্য ওনাগার সৌদিতে আনা হয়।

প্রায় ৯৩৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে প্রাণীগুলোকে প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান রয়্যাল রিজার্ভে নেওয়া হয়। নতুন পরিবেশে তারা দ্রুত মানিয়ে নেয় এবং পরবর্তী সময়ে প্রজনন শুরু করে।

এটি ছিল সৌদি আরবের মাটিতে এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর ওনাগারের প্রথম বন্য জনসংখ্যা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ।

পুনঃপ্রবর্তিত ওনাগারগুলোর মধ্যে প্রজননের ফল হিসেবে ২০২৫ সালের জুনে একটি পুরুষ শাবকের জন্ম হয়। তবে সংরক্ষণ কর্মকর্তারা সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি প্রকাশ করেননি।

কারণ ওনাগারের শাবকদের জন্য প্রথম বছরটি অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। সৌদি রয়্যাল রিজার্ভ জানিয়েছে, বন্য পরিবেশে ওনাগার শাবকের প্রথম বছরের বেঁচে থাকার হার প্রায় ৫০ শতাংশ। ফলে শাবকটি এক বছর সুস্থভাবে পার করার পরই তার জন্মের খবর প্রকাশ করা হয়।

ওনাগার ফিরিয়ে আনার উদ্যোগটি সৌদির বৃহত্তর ‘Rewilding Arabia’ কর্মসূচির অংশ। এই কর্মসূচির লক্ষ্য হলো আরব উপদ্বীপে ঐতিহাসিকভাবে বিচরণ করা স্থানীয় প্রাণীদের তাদের পুরোনো আবাসস্থলে ফিরিয়ে আনা।

রয়্যাল রিজার্ভের পরিকল্পনায় মোট ২৩টি স্থানীয় বন্যপ্রাণী প্রজাতি তাদের ঐতিহাসিক আবাসস্থলে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রয়েছে। ওনাগারের পাশাপাশি ইতোমধ্যে আরও কয়েকটি প্রজাতি পুনঃপ্রবর্তনের কাজ এগিয়েছে।

সৌদি ন্যাশনাল সেন্টার ফর ওয়াইল্ডলাইফও দেশজুড়ে প্রজনন ও পুনঃপ্রবর্তন কর্মসূচির মাধ্যমে বিপন্ন স্থানীয় প্রাণীদের সংখ্যা বাড়ানোর কাজ করছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংস্থাটি জানিয়েছিল, বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় মোট ১০ হাজারের বেশি বন্যপ্রাণী পুনঃপ্রবর্তন করা হয়েছে।

ওনাগারকে আন্তর্জাতিকভাবে Endangered বা বিপন্ন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। বিশেষ করে পারস্য ওনাগারের বন্য জনসংখ্যা খুবই সীমিত।

শিকার, আবাসস্থল হারানো এবং মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে এ প্রাণীর সংখ্যা বহু অঞ্চলে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে নতুন এলাকায় এর বন্য জনসংখ্যা প্রতিষ্ঠা বৈশ্বিক সংরক্ষণ প্রচেষ্টার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

সৌদি কর্তৃপক্ষের মতে, ওনাগারের প্রত্যাবর্তন শুধু একটি প্রাণীকে ফিরিয়ে আনার ঘটনা নয়; এটি মরুভূমির হারিয়ে যাওয়া একটি পরিবেশগত ভারসাম্য পুনর্গঠনের অংশ।

বন্য তৃণভোজী প্রাণী হিসেবে ওনাগার মরুভূমির খাদ্যশৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা ঘাস ও অন্যান্য উদ্ভিদ খেয়ে বেঁচে থাকে এবং চলাচলের মাধ্যমে বীজ ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

একটি প্রজাতি যখন কোনো বাস্তুতন্ত্র থেকে হারিয়ে যায়, তখন তার সঙ্গে সম্পর্কিত খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশগত প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আসে। তাই ওনাগারের মতো স্থানীয় প্রাণীকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগকে শুধু প্রাণী সংরক্ষণ নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সৌদি আরব গত কয়েক বছরে মরুভূমি ও পাহাড়ি অঞ্চলের বন্যপ্রাণী পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের কর্মসূচি নিয়েছে। এর মধ্যে আরবীয় অরিক্স, আরবীয় খরগোশসহ বিভিন্ন স্থানীয় প্রজাতিকে তাদের ঐতিহাসিক আবাসস্থলে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।

ওনাগারের প্রত্যাবর্তন এই উদ্যোগকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করেছে। কারণ প্রাণীটি একসময় আরব উপদ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশের অংশ ছিল, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে আর দেখা যায়নি।

সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের কাছে ওনাগারের জন্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি প্রমাণ করছে যে পুনঃপ্রবর্তিত প্রাণীগুলো নতুন পরিবেশে টিকে থাকতে এবং প্রজনন করতে পারছে।

একটি প্রাণীকে অন্য এলাকা থেকে এনে কোনো সংরক্ষিত অঞ্চলে ছেড়ে দেওয়া এক বিষয়; আর সেখানে তার নিজের মতো করে বেঁচে থাকা ও নতুন প্রজন্ম তৈরি করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সৌদি আরবে ওনাগারের প্রথম শাবকের জন্ম তাই পুনঃবন্যায়ন কর্মসূচির বাস্তব সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।

সূত্র: সৌদি প্রেস এজেন্সি (SPA)

ChannelNRB Footer