News Ticker
221.png

চীনের অর্থনীতিকে আমূলে বদলে দেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রোংজির মৃত্যু

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২ আগস্ট, ২০২৬ ২২:৪১

আপডেট: ১২ আগস্ট, ২০২৬ ২২:৫৭

শেয়ার

শেয়ার

চীনের অর্থনীতিকে আমূলে বদলে দেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রোংজির মৃত্যু
ছবি: সংগৃহীত

চীনের অর্থনীতিতে ব্যাপক সংস্কারের জন্য পরিচিত দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রোংজি (Zhu Rongji) মারা গেছেন। বুধবার (১২ আগস্ট) ৯৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে।

১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে চীনের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে বিবেচনা করা হয় ঝু রোংজিকে। ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সংস্কার, সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন এবং বাজারমুখী অর্থনৈতিক নীতির প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

ঝু রোংজি এমন এক সময়ে চীনের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন, যখন দেশটির অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তাঁর নেতৃত্বে লোকসানে থাকা ও অদক্ষ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত সংস্কার করা হয়।

এই সংস্কারের ফলে বিপুলসংখ্যক কর্মী চাকরি হারান এবং স্বল্পমেয়াদে সামাজিক চাপ তৈরি হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করার ভিত্তি তৈরিতে এসব পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

ঝু রোংজির প্রধানমন্ত্রিত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল চীনের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (WTO) যোগদানের প্রক্রিয়া। তাঁর সরকারের সময় চীন বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থার সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হয়।

২০০১ সালে WTO-তে চীনের প্রবেশ দেশটির অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করে। পরবর্তী সময়ে চীনের রপ্তানি, উৎপাদন ও বৈদেশিক বিনিয়োগের দ্রুত সম্প্রসারণে এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।

ঝু রোংজির দায়িত্ব পালনের সময়ে চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী। তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের ওপরে ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে শহরাঞ্চলে আবাসন মালিকানার বিস্তারও শুরু হয়, যা পরবর্তী কয়েক দশকে চীনের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়।

অর্থনীতিকে আরও বাজারমুখী করার পাশাপাশি ঝু সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও করব্যবস্থার সংস্কারেও ভূমিকা রাখেন। তাঁর প্রশাসনিক ধরন ছিল কঠোর, সরাসরি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার জন্য পরিচিত।

ঝু রোংজি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের জন্যও পরিচিত ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে দৃঢ়তা ও স্পষ্টভাষী বক্তব্যের ভাবমূর্তি জড়িয়ে আছে।

তাঁর নেতৃত্বের সময় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের পাশাপাশি সরকারি ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ কারণে চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের ইতিহাসে তাঁর নাম একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে।

ঝু রোংজির রাজনৈতিক জীবনও ছিল ঘটনাবহুল। চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় তিনি রাজনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হন এবং একপর্যায়ে প্রত্যন্ত এলাকায় শ্রম করার জন্য পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি আবার প্রশাসনিক কাঠামোয় উঠে এসে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকে পরিণত হন।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিনি সাংহাইয়ের মেয়র ও পরে কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। সাংহাইয়ে তাঁর প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডও অর্থনৈতিক সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং জাতীয় পর্যায়ে তাঁর উত্থানের পথ তৈরি করে।

ঝু রোংজির উত্তরাধিকার নিয়ে মূল্যায়নে তাঁর সংস্কারের ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুই দিকই উঠে আসে। একদিকে রাষ্ট্রীয় খাতের সংস্কার, WTO-তে যোগদান এবং বাজারভিত্তিক অর্থনীতির সম্প্রসারণ চীনের পরবর্তী প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করে। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের ফলে ব্যাপক কর্মসংস্থান সংকট ও সামাজিক চাপ তৈরি হয়েছিল।

তবু আধুনিক চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তরের ইতিহাসে ঝু রোংজির ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সময়কার সংস্কারগুলো চীনকে বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করার পথ প্রশস্ত করে এবং পরবর্তী দুই দশকের অর্থনৈতিক উত্থানের অন্যতম ভিত্তি তৈরি করে।

৯৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান হলো।

সূত্র: এপি নিউজ

ChannelNRB Footer