যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)–এর ‘মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধী’ তালিকায় থাকা মাইকেল লিজাসো মারাসিগানকে ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে কোটি কোটি ডলারের প্রতারণা ও অর্থ পাচারের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে ২১ বছরের বেশি কারাদণ্ড পাওয়া এই ব্যক্তি বর্তমানে পলাতক। তাকে ধরিয়ে দিতে এফবিআই সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে।
সম্প্রতি হাওয়াই নিউজ নাউ জানিয়েছে, ম্যানিলার একটি ক্যাফে থেকে মারাসিগান বের হওয়ার ছবি তোলা হয়েছে। ছবিটি গত ১৫ মার্চ ম্যানিলায় তোলা বলে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে। ছবিটি প্রকাশের পর পলাতক এই আসামির অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
৫৪ বছর বয়সী মারাসিগান যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইনের দ্বৈত নাগরিক। এফবিআইয়ের বর্তমান ‘মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধী’ তালিকায় তার নাম রয়েছে। সংস্থাটির তালিকায় তিনি এমন ব্যক্তিদের একজন, যাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ বা দণ্ড রয়েছে।
মারাসিগানের বিরুদ্ধে গুয়ামে পরিচালিত একটি বিঙ্গো কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের প্রতারণা ও অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়। প্রসিকিউটরদের তথ্য অনুযায়ী, গ্রাহকদের বলা হয়েছিল—বিঙ্গো থেকে পাওয়া অর্থ অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়ে শ্রীনার্স হাসপাতালে যাতায়াতের খরচে ব্যবহার করা হবে। কিন্তু তদন্তে উঠে আসে, বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যক্তিগত কাজে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
মার্কিন তদন্তকারীদের হিসাবে, ২০১৫ সাল থেকে ২০২১ সালের শেষ পর্যন্ত ওই বিঙ্গো কার্যক্রম থেকে অন্তত ৩৪ মিলিয়ন ডলার আয় হয়েছিল। এর মধ্যে ১০ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ মারাসিগান ও তার সহযোগীরা ব্যক্তিগত কাজে সরিয়ে নিয়েছিলেন বলে প্রসিকিউটররা অভিযোগ করেন।
মামলায় তার বিরুদ্ধে অবৈধ জুয়া ব্যবসা পরিচালনার ষড়যন্ত্র, অর্থ পাচারের ষড়যন্ত্র, অর্থ পাচার এবং তারবার্তা ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতারণার ষড়যন্ত্রসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়।
২০২৫ সালের মে মাসে মারাসিগান এসব অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। পরে চিকিৎসার কারণে আদালতের অনুমতি নিয়ে ফিলিপাইনে যাওয়ার সুযোগ পান তিনি। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে ফেরেননি এবং ২০২৫ সালের জুনে আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। এরপর তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
পরবর্তীতে আদালত তার অনুপস্থিতিতেই সাজা ঘোষণা করে।
২০২৬ সালের ১৮ মে মারাসিগানকে ২৬২ মাসের ফেডারেল কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অর্থাৎ প্রায় ২১ বছর ১০ মাস তাকে কারাগারে থাকতে হবে।
এ ছাড়া তাকে ১০ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ, প্রায় ৫ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন ডলার বাজেয়াপ্তির অর্থ এবং অতিরিক্ত অর্থদণ্ড দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু সাজা ঘোষণার সময় তিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। ফলে বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে নয়, বরং পলাতক অবস্থায় রয়েছেন।
হাওয়াই নিউজ নাউয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ম্যানিলায় একটি ক্যাফে থেকে বের হওয়ার সময় মারাসিগানের ছবি তোলা হয়। সংবাদমাধ্যমটির হাতে থাকা ছবিটি পলাতক ব্যক্তির অবস্থান সম্পর্কে তদন্তকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে বলে সাবেক এফবিআই কর্মকর্তা টম সাইমন মন্তব্য করেছেন।
তবে এফবিআই আনুষ্ঠানিকভাবে তার বর্তমান সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিশ্চিত করেনি। সংস্থাটি শুধু জানিয়েছে, মারাসিগান এখনো তাদের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধী’ তালিকায় রয়েছেন এবং তাকে খুঁজে বের করতে তথ্য চাওয়া হচ্ছে।
মারাসিগানকে গ্রেপ্তারে সহায়তা করতে পারে—এমন তথ্যের জন্য এফবিআই সর্বোচ্চ ১৫০,০০০ মার্কিন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে। তার অবস্থান সম্পর্কে তথ্য থাকলে মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে জানাতে বলা হয়েছে।
এফবিআইয়ের তালিকায় মারাসিগানের নাম এখনো সক্রিয় রয়েছে এবং সংস্থাটি তাকে বিচারের আওতায় আনতে তথ্য সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছে।
মারাসিগানের ফিলিপাইনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে এবং তিনি দেশটির নাগরিকও। চিকিৎসার কারণ দেখিয়ে আদালতের অনুমতি নিয়ে সেখানে যাওয়ার পর তিনি আর যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসেননি। এ কারণে ফিলিপাইনেই তার আত্মগোপনের সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।
ফিলিপাইনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মার্কিন কর্তৃপক্ষের যোগাযোগ হয়েছে কি না, সে বিষয়েও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রশ্ন উঠেছে। হাওয়াই নিউজ নাউ জানিয়েছে, ফিলিপাইনে মার্কিন কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাওয়ার কথা দেশটির কনস্যুলার কর্তৃপক্ষ জানায়নি।
মামলাটির সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো—যে অর্থ অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসার জন্য ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিল, সেই অর্থের একটি বড় অংশ আত্মসাতের অভিযোগ। এ কারণে মারাসিগানের বিরুদ্ধে শুধু আর্থিক প্রতারণা নয়, মানবিক সহায়তার উদ্দেশ্যে সংগৃহীত অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগও ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
এক সাবেক শ্রীনার্স হাসপাতাল কর্মী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বহু বছর আগে গুয়ামের বিঙ্গো কার্যক্রমের বিপণন নিয়ে অনিয়মের বিষয়টি তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন।
মারাসিগান বর্তমানে কোথায় আছেন, তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত না হলেও ম্যানিলায় তার ছবি প্রকাশ পাওয়ায় তদন্তকারীদের জন্য নতুন সূত্র তৈরি হয়েছে। এফবিআইয়ের মতে, তিনি এখনো পলাতক এবং তাকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের দেওয়া সাজা কার্যকর করাই কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য।
সূত্র: হাওয়াই নিউজ নাউ
আরও পড়ুন:







