সাপের উপদ্রব কমাতে একসময় বাংলাদেশ থেকে বেজি নিয়ে গিয়েছিল জাপান। উদ্দেশ্য ছিল বিষধর হাবু সাপ ও ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু প্রকৃতির ওপর মানুষের এই হস্তক্ষেপ শেষ পর্যন্ত উল্টো বিপদ ডেকে আনে। সাপ দমনের বদলে বেজির সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে এবং তারা শিকার করতে শুরু করে জাপানের স্থানীয় ও বিপন্ন প্রাণীকে।
ঘটনাটি জাপানের দক্ষিণাঞ্চলের আমামি ওশিমা দ্বীপের। সেখানে কয়েক দশক ধরে বেজির বিরুদ্ধে চালাতে হয়েছে ব্যাপক নির্মূল অভিযান। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাপান সরকার ঘোষণা করে, দীর্ঘ ৩১ বছরের প্রচেষ্টার পর দ্বীপটিকে বেজিমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
জাপানের ওকিনাওয়া ও আশপাশের দ্বীপগুলোতে বিষধর হাবু সাপ মানুষের জন্য দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগের কারণ ছিল। সাপের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের প্রাকৃতিক উপায় হিসেবে বেজিকে ব্যবহার করার চিন্তা করা হয়।
গবেষণা অনুযায়ী, ১৯১০ সালে বাংলাদেশ থেকে ১৩–১৭টি ছোট ভারতীয় বেজি (Small Indian mongoose) ওকিনাওয়া দ্বীপে নেওয়া হয়। একই সময়ে টোনাকি দ্বীপেও চারটি বেজি নেওয়া হয়েছিল।
বেজি সাধারণত সাপের সঙ্গে লড়াই করতে পারে এবং বিষধর সাপের বিষের প্রতিরোধক্ষমতাও তাদের রয়েছে। ফলে সে সময় ধারণা করা হয়েছিল, বেজি ছেড়ে দিলে হাবু সাপের সংখ্যা কমে যাবে।
কিন্তু প্রকৃতি মানুষের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলেনি।
বেজি আমদানি করার সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল তাদের আচরণ। হাবু সাপ মূলত রাতে সক্রিয়, আর বেজি সাধারণত দিনের বেলায় বেশি সক্রিয়। ফলে সাপ ও বেজির মুখোমুখি হওয়ার সুযোগই ছিল তুলনামূলক কম।
গবেষণায় দেখা গেছে, সাপ শিকারের বদলে বেজিরা দ্বীপের অন্যান্য সহজলভ্য প্রাণী শিকার করতে শুরু করে। বিশেষ করে স্থানীয় প্রাণীদের ওপর এর মারাত্মক প্রভাব পড়ে।
অর্থাৎ যে প্রাণীকে একটি নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য আনা হয়েছিল, সেটিই পরে নতুন পরিবেশগত সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আমামি ওশিমা দ্বীপে রয়েছে অত্যন্ত বিরল আমামি খরগোশ, যা বিশ্বের অন্য কোথাও স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায় না। বেজির শিকারের কারণে এই স্থানীয় প্রাণীসহ বিভিন্ন ছোট স্তন্যপায়ী ও পাখি হুমকির মুখে পড়ে।
জাপানের পরিবেশ কর্মকর্তাদের মতে, বেজির কারণে দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছিল।
ফলে সাপ দমনের জন্য নেওয়া বেজি শেষ পর্যন্ত সাপের পাশাপাশি দ্বীপের অন্য প্রাণী ও পুরো পরিবেশব্যবস্থার জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
শুরুতে বেজির সংখ্যা ছিল খুবই কম। কিন্তু দ্বীপের অনুকূল পরিবেশে তারা দ্রুত বংশবিস্তার করে।
এক পর্যায়ে আমামি ওশিমায় বেজির সংখ্যা প্রায় ১০ হাজারে পৌঁছে যায় বলে গবেষণা ও সরকারি তথ্য থেকে জানা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জাপানকে দীর্ঘমেয়াদি নির্মূল কর্মসূচি হাতে নিতে হয়।
১৯৯৯ সাল থেকে ব্যাপকভাবে বেজি ধরার অভিযান শুরু হয়। শুধু ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যেই প্রায় ৯,৯৬০টি বেজি ধরা হয়েছিল বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বেজির সংখ্যা কমানো সহজ ছিল না। প্রাণীগুলোকে শনাক্ত ও ধরতে ফাঁদ, প্রশিক্ষিত কুকুর এবং বিভিন্ন ধরনের নজরদারি ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়।
দশকের পর দশক ধরে অভিযান চালানোর পর অবশেষে ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জাপান ঘোষণা করে, আমামি ওশিমা থেকে বেজি নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে। এই কর্মসূচিতে প্রায় ৩১ বছর সময় লেগেছে।
এটি শুধু একটি প্রাণী নির্মূলের ঘটনা নয়; পরিবেশবিদদের কাছে এটি মানুষের হাতে একটি নতুন প্রাণীকে অন্য পরিবেশে এনে দেওয়ার সম্ভাব্য বিপদের বড় উদাহরণ।
মূল ব্যর্থতার কারণ ছিল স্থানীয় পরিবেশ ও প্রাণীদের আচরণ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকা।
বেজি দিনের বেলায় বেশি সক্রিয় হলেও হাবু সাপ মূলত রাতে চলাফেরা করে। ফলে যে প্রাণীকে সাপের প্রাকৃতিক শত্রু হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, তারা বাস্তবে নিয়মিত মুখোমুখি হয়নি। বরং বেজিরা সহজে শিকারযোগ্য স্থানীয় প্রাণীর দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে।
এতে একটি সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে আরও বড় পরিবেশগত সমস্যা তৈরি হয়।
আমামি ওশিমার ঘটনা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে invasive species বা আগ্রাসী বহিরাগত প্রজাতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
একটি প্রাণী তার নিজস্ব বাস্তুতন্ত্রে যে ভূমিকা পালন করে, অন্য পরিবেশে গিয়ে তার আচরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। সেখানে প্রাকৃতিক শিকারি না থাকা, পর্যাপ্ত খাবার পাওয়া এবং দ্রুত বংশবিস্তার করার সুযোগ থাকলে সেটি স্থানীয় প্রাণীদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
জাপানের স্থানীয় কর্মকর্তারাও এই ঘটনার মাধ্যমে শিক্ষা নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। তাদের মতে, আমদানি করা বেজি স্থানীয় পরিবেশে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, সেটি না বুঝেই পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে পরে বিপুল অর্থ ও সময় ব্যয় করে প্রাণীটি নির্মূল করতে হয়েছে।
সাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ থেকে নেওয়া কয়েকটি বেজি শেষ পর্যন্ত হাজার হাজারে পরিণত হয়েছিল। তাদের ঠেকাতে জাপানকে কয়েক দশক ধরে অভিযান চালাতে হয়েছে। ২০২৪ সালে এসে সেই দীর্ঘ অভিযানের সমাপ্তি ঘটে।
সূত্র:এএফপি আরও পড়ুন:







