News Ticker
221.png

যুক্তরাষ্ট্রে বিশাল এক ‘গোপন বাহিনী’ বানিয়ে ফেলেছে উত্তর কোরিয়া!

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট, ২০২৬ ২১:১৮

আপডেট: ১৩ আগস্ট, ২০২৬ ২১:৫৪

শেয়ার

শেয়ার

যুক্তরাষ্ট্রে বিশাল এক ‘গোপন বাহিনী’ বানিয়ে ফেলেছে উত্তর কোরিয়া!
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গোপনে ঢুকে পড়েছে উত্তর কোরিয়ার একটি বিশাল ‘গোপন কর্মীবাহিনী’। তবে এটি কোনো সামরিক বাহিনী নয়। উত্তর কোরিয়ার হাজার হাজার আইটি কর্মী ভুয়া পরিচয়, চুরি করা মার্কিন নাগরিকদের তথ্য এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিতে রিমোট চাকরি নিচ্ছেন—এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক বছরব্যাপী অনুসন্ধানে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব কর্মীর উপার্জনের বড় অংশ উত্তর কোরিয়ার শাসক কিম জং উনের সরকারের কাছে পৌঁছায়। মার্কিন কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এই অর্থ দেশটির নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত কর্মসূচি, বিশেষ করে অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর অনুসন্ধানে একটি উত্তর কোরীয় দলের কার্যক্রম অনুসরণ করা হয়। দেখা যায়, মাত্র তিন মাসের কিছু বেশি সময়ে দলটি ১ হাজারের বেশি মার্কিন কোম্পানিতে চাকরির আবেদন করেছিল।

চাকরির আবেদন থেকে শুরু করে জীবনবৃত্তান্ত ও কভার লেটার তৈরি—প্রায় প্রতিটি ধাপেই এআই ব্যবহার করা হয়েছে। ভুয়া পরিচয়ের সঙ্গে এআই-তৈরি ছবি ও অন্যান্য প্রযুক্তিও ব্যবহার করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

উত্তর কোরিয়ার এই নেটওয়ার্কের অন্যতম প্রধান কৌশল হলো মার্কিন নাগরিকদের পরিচয় চুরি করা।

চুরি করা নাম, ঠিকানা ও অন্যান্য পরিচয় ব্যবহার করে তৈরি করা হয় ভুয়া চাকরির প্রোফাইল। এরপর রিমোট সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ওয়েব ডেভেলপারসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি-ভিত্তিক পদে আবেদন করা হয়।

মার্কিন এফবিআই জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার আইটি কর্মীরা যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সহযোগীদের সাহায্যে নিজেদের অবস্থান গোপন করে কোম্পানির নেটওয়ার্কে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে।

এই ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ল্যাপটপ ফার্ম।

কোনো মার্কিন কোম্পানি নতুন কর্মীকে ল্যাপটপ পাঠালে সেটি প্রকৃত কর্মীর কাছে না গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সহযোগীর বাড়িতে পৌঁছাতে পারে। সেখান থেকে উত্তর কোরিয়ায় থাকা প্রকৃত কর্মী দূরবর্তীভাবে সেই কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণ করে কাজ করেন।

ফলে কোম্পানির কাছে মনে হয়, কর্মী যুক্তরাষ্ট্রেই বসে কাজ করছেন। এফবিআই বলছে, মার্কিন সহযোগীরা এ ধরনের ল্যাপটপ গ্রহণ, ইন্টারনেট সংযোগ, রিমোট অ্যাকসেস এবং অর্থ লেনদেনে সহায়তা করে থাকে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো—এই কর্মীরা কোম্পানির অভ্যন্তরীণ সিস্টেমে বৈধ কর্মী হিসেবে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে যান।

মার্কিন বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কিছু ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার আইটি কর্মীরা নিয়োগ পাওয়ার পর সংবেদনশীল ব্যবসায়িক তথ্য, সামরিক প্রযুক্তি ও ভার্চুয়াল মুদ্রা চুরি করেছে।

অর্থাৎ বিষয়টি শুধু ভুয়া চাকরি নেওয়া বা নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি কোম্পানির সাইবার নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে এই গোপন কর্মীবাহিনীর মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার বছরে আয় করতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিছু কর্মী বছরে কয়েক লাখ ডলার পর্যন্ত বেতন পেতে পারেন। অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে উপার্জনের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ায় পাঠানো হয়।

তবে এগুলো অনুসন্ধানভিত্তিক হিসাব; উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে এমন আয়ের পরিমাণ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।

আগে ভুয়া পরিচয়ে চাকরি পেতে জীবনবৃত্তান্ত, নকল নথি ও সাজানো অনলাইন প্রোফাইল ব্যবহার করা হতো। এখন এআই সেই প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করেছে।

এই প্রতারণার শিকার শুধু কোম্পানিগুলো নয়। যেসব মার্কিন নাগরিকের পরিচয় চুরি করা হচ্ছে, তারাও বড় সমস্যায় পড়ছেন।

চুরি করা পরিচয় দিয়ে অন্য কেউ চাকরি করলে ওই ব্যক্তির নামে ব্যাংক হিসাব, করসংক্রান্ত তথ্য বা অন্যান্য আর্থিক রেকর্ড তৈরি হতে পারে। ফলে প্রকৃত পরিচয়ধারী ব্যক্তির ঋণ, ব্যাংকিং কিংবা অন্যান্য আর্থিক কার্যক্রমেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এফবিআই বহুদিন ধরেই মার্কিন কোম্পানিগুলোকে উত্তর কোরিয়ার আইটি কর্মীদের বিষয়ে সতর্ক করে আসছে।

সংস্থাটির মতে, কোম্পানিগুলোকে নিয়োগের সময় পরিচয়পত্র, পূর্ববর্তী চাকরি ও শিক্ষাগত যোগ্যতা সরাসরি যাচাই করতে হবে। শুধু অনলাইন সাক্ষাৎকার বা নথির ওপর নির্ভর না করে প্রার্থীর পরিচয় সম্পর্কে অতিরিক্ত যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এফবিআই আরও বলেছে, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে আইটি কর্মী নিয়োগ করা কোম্পানিগুলো বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছে।

মার্কিন বিচার বিভাগ এরই মধ্যে উত্তর কোরিয়ার এই নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযান চালিয়েছে।

২০২৫ সালের একটি বড় অভিযানে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানায়, উত্তর কোরিয়ার কর্মীরা মার্কিন নাগরিক সেজে বিভিন্ন কোম্পানিতে চাকরি নিয়েছিল। তাদের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্রে ল্যাপটপ ফার্ম ও ভুয়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিযোগও আনা হয়।

একটি মামলায় অভিযুক্তরা ৮০ জনের বেশি মার্কিন নাগরিকের পরিচয় ব্যবহার করে ১০০টির বেশি কোম্পানিতে রিমোট চাকরি নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

উত্তর কোরিয়া আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ সীমিত। ফলে সাইবার অপরাধ, ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি এবং বিদেশে গোপনে আইটি কর্মী পাঠিয়ে অর্থ উপার্জন—এসবকে দেশটির অর্থ সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, বিদেশে আইটি চাকরি থেকে পাওয়া অর্থ শেষ পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার সরকারের কাছে যায় এবং এর একটি অংশ দেশটির অস্ত্র কর্মসূচিতে ব্যবহৃত হয়।

সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ কঠিন। কারণ কর্মীরা ভুয়া পরিচয়ে কাজ করেন এবং বিভিন্ন দেশের সহযোগীদের মাধ্যমে নিজেদের প্রকৃত অবস্থান লুকিয়ে রাখেন।

তবে এফবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, হাজার হাজার উত্তর কোরীয় আইটি কর্মী বিশ্বব্যাপী চাকরির বাজারে সক্রিয়।

সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে তাই উত্তর কোরিয়ার এই নেটওয়ার্ককে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও ব্যবসা খাতে একটি বড় গোপন কর্মীবাহিনী হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।

সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

ChannelNRB Footer