যুক্তরাষ্ট্রের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের স্মার্টফোন ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমানে দেশটির অন্তত ৩৯টি অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসিতে স্কুলে শিক্ষার্থীদের ফোন ব্যবহার সীমিত বা নিষিদ্ধ করার নীতি কার্যকর হয়েছে। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার সময় বিষয়টি আবারও ব্যাপক আলোচনায় এসেছে।
তবে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বলছে, শুধু ফোন কেড়ে নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ফোনের বিকল্প হিসেবে কী সুবিধা দেওয়া হবে এবং শিক্ষার্থীরা কীভাবে প্রযুক্তিনির্ভর জীবন থেকে ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশে ফিরবে—সেটিও ভাবতে হবে।
মার্কিন স্কুল কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান যুক্তি হলো স্মার্টফোন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ নষ্ট করে। ক্লাসের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং, ভিডিও ও গেম শিক্ষার্থীদের সহজেই অন্যদিকে নিয়ে যায়।
ফোন ব্যবহারের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক চাপ ও অনলাইনে অতিরিক্ত সময় কাটানোর বিষয়টিও যুক্ত হচ্ছে। এ কারণেই বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য স্কুল চলাকালীন ব্যক্তিগত ফোন ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ৩৯টি অঙ্গরাজ্যেই একই ধরনের ‘সম্পূর্ণ ফোন নিষেধাজ্ঞা’ নেই। কোথাও পুরো স্কুল দিবসজুড়ে ফোন বন্ধ রাখতে হয়, কোথাও শুধু ক্লাস চলাকালে ব্যবহার নিষিদ্ধ, আবার কোনো কোনো অঙ্গরাজ্যে স্থানীয় স্কুল ডিস্ট্রিক্টকে নিজস্ব নীতি তৈরির সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনের (FCC) জুন ২০২৬-এর নথিতে Education Week-এর হিসাব উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, ২০২৬ সালের শুরুতে অন্তত ৩৩টি অঙ্গরাজ্য, ওয়াশিংটন ডিসি এবং Department of Defense Dependents Schools-এ স্কুলে শিক্ষার্থীদের ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ বা সীমিত করার ব্যবস্থা ছিল।
কিছু অঙ্গরাজ্যে চালু হয়েছে ‘bell-to-bell’ policy। অর্থাৎ স্কুলের প্রথম ঘণ্টা থেকে শেষ ঘণ্টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিগত স্মার্টফোন ব্যবহার করতে পারবে না।
কিছু জায়গায় নিষেধাজ্ঞার আওতায় স্মার্টওয়াচ, ইয়ারবাড বা অন্যান্য ব্যক্তিগত ইলেকট্রনিক ডিভাইসও রাখা হয়েছে। কানসাসে নতুন আইন অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের পুরো স্কুল দিবসে ফোন, ইয়ারবাড ও স্মার্টওয়াচ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করা শিক্ষার্থীদের অনেকেই কিন্তু ফোন ব্যবহারের স্বাধীনতা পুরোপুরি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি করছে না।
তাদের বক্তব্য—যদি স্কুল কর্তৃপক্ষ ফোন সরিয়ে দেয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের সামাজিক যোগাযোগ, মানসিক চাপ মোকাবিলা এবং অবসর কাটানোর বিকল্প ব্যবস্থাও তৈরি করতে হবে।
নিউইয়র্কের এক শিক্ষার্থী অলিভিয়া হাওয়ার্ডের ভাষায়, প্রযুক্তির সঙ্গে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের কাছ থেকে হঠাৎ করে ডিভাইস সরিয়ে নেওয়া সহজ নয়; তাই এর পরিবর্তে কী দেওয়া হবে, সেটিও বিবেচনা করা দরকার।
কিছু স্কুল ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের ফোনবিহীন পরিবেশে মানিয়ে নিতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে।
নিউইয়র্কে একটি যুব উদ্যোগের আওতায় স্কুলগুলোতে টেক-ফ্রি কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। কোথাও শিক্ষার্থীদের জন্য বই, কারুশিল্পের উপকরণ ও বিশ্রামের জায়গা তৈরি করা হয়েছে।
একটি স্কুলে ফোন ব্যবহারের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ডিটক্স রুম’ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে বই, স্ট্রেস-রিলিফ খেলনা ও আরাম করার ব্যবস্থা থাকবে।
ফোন সরিয়ে নেওয়ার পর অনেক স্কুলে শিক্ষার্থীদের একে অপরের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ বাড়ছে।
কিছু শিক্ষার্থী জানিয়েছে, ফোন নিষেধাজ্ঞার পর স্কুলের করিডোরে কথাবার্তা বেড়েছে। তবে একই সঙ্গে বেশি অন্তর্মুখী শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবেশটি কখনো কখনো অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে।
এ কারণে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে গ্রুপ অ্যাসাইনমেন্ট, সরাসরি আলোচনা এবং অন্যান্য সামাজিক কার্যক্রম বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছে।
অভিভাবকদের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ
ফোন নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো জরুরি পরিস্থিতিতে সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ।
অনেক অভিভাবক মনে করেন, স্কুলে ফোন থাকলে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে সন্তানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা সহজ হয়। তাই অনেক স্কুল সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে ফোন নিরাপদে সংরক্ষণ করে রাখার ব্যবস্থা করছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার কিছু স্কুলে শিক্ষার্থীদের ফোন লক করে রাখার জন্য বিশেষ পাউচ বা স্টোরেজ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। জরুরি পরিস্থিতি বা চিকিৎসাজনিত প্রয়োজন হলে ব্যতিক্রমও রাখা হয়েছে।
স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ বাড়ছে।
২০২৫ সালে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য স্কুলে ফোন ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপে নতুন আইন করেছে। ২০২৬ সালেও সেই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ফলে এখন অনেক স্কুলে প্রশ্নটি আর ‘ফোন নিষিদ্ধ করা হবে কি না’ নয়; বরং ‘কীভাবে এবং কোন পদ্ধতিতে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হবে’—এটাই মূল আলোচনার বিষয়।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
আরও পড়ুন:







