মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেই সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। এর অংশ হিসেবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে অত্যাধুনিক বিমানবাহী রণতরী
ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হচ্ছে। রণতরীটি বর্তমানে দীর্ঘ সময় ধরে ওই অঞ্চলে মোতায়েন থাকা ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের জায়গা নেবে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
মার্কিন নৌবাহিনীর পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে ভিয়েতনামের দা নাং থেকে যাত্রা শুরু করে মালাক্কা প্রণালি পেরিয়ে ভারত মহাসাগরের দিকে এগোচ্ছে। এরপর এটি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এর সঙ্গে একটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপও থাকবে।
নতুন এই মোতায়েনকে নিয়মিত রোটেশনের অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হলেও, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এর কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি। বর্তমানে
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন দীর্ঘ সময় ধরে ইরানবিরোধী সামরিক অভিযানে যুক্ত রয়েছে এবং সেটিকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
এদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ “অনির্দিষ্টকাল” বজায় রাখার সক্ষমতা রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন যুদ্ধজাহাজ পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন করে এই অভিযান দীর্ঘ সময় চালিয়ে যেতে পারবে মার্কিন নৌবাহিনী।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেই এমন ঘোষণা এসেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজে সাম্প্রতিক সময়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ১৪ আগস্ট আরও দুটি জাহাজ আক্রান্ত হওয়ার খবরের পর সেখানে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
বিমানবাহী রণতরী কার্যত সমুদ্রে ভাসমান একটি সামরিক বিমানঘাঁটির মতো কাজ করে। এর ওপর যুদ্ধবিমান, নজরদারি বিমান ও হেলিকপ্টার মোতায়েন করা যায়। ফলে স্থলঘাঁটির ওপর নির্ভরতা ছাড়াই দূরবর্তী এলাকায় বিমান অভিযান পরিচালনা এবং আকাশ ও সমুদ্রপথে নজরদারি করা সম্ভব।
ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন-এর মতো রণতরীকে ঘিরে থাকা ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপে সাধারণত গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারসহ বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধজাহাজ থাকে। এসব জাহাজ বিমান প্রতিরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ এবং সমুদ্রপথ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে সমুদ্রে রয়েছে এবং ২০২৬ সালের শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানবিরোধী অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দীর্ঘ সময়ের এই মোতায়েনের কারণে জাহাজটির নাবিকদের জীবনযাপন, খাদ্য ও সরঞ্জাম সরবরাহ এবং মানসিক চাপ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী অবশ্য এসব প্রতিবেদনের কিছু দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, পরিস্থিতি সংবাদমাধ্যমে যেভাবে তুলে ধরা হয়েছে তা যথাযথ নয়। তবে লিংকনের ক্রুদের রোটেশন এবং জাহাজটিকে দেশে ফেরানোর প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছেন তিনি।
ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও অর্থনৈতিক ফ্রন্টগুলোর একটি হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবহন হয়। সাম্প্রতিক হামলা ও নৌ অবরোধের কারণে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এ অবস্থায় নতুন একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটনের সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার সক্ষমতারও বার্তা দিচ্ছে।
ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন-এর মোতায়েন নিজে থেকেই নতুন কোনো সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা নয়। এটি মূলত বিদ্যমান মার্কিন নৌবাহিনীর রোটেশনের অংশ। তবে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালিতে হামলা এবং নৌ অবরোধের মতো একাধিক উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে এই রণতরীর আগমন মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন একদিকে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বজায় রাখছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি নৌ অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতির কথাও প্রকাশ্যে জানাচ্ছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও কতটা বিস্তৃত হবে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের বড় উদ্বেগ।
সূত্র: রয়টার্স
আরও পড়ুন:







