আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট কাবুল দখলের পর নারীদের শিক্ষা, চাকরি, চলাফেরা ও জনজীবনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে একের পর এক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে তালেবান সরকার। পাঁচ বছর পরও সেই নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন না আসায় হতাশা ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে দেশটির লাখো নারী ও কিশোরীর।
তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর শুরুতে নারী অধিকার ও শিক্ষার বিষয়ে কিছুটা নমনীয় অবস্থানের ইঙ্গিত দিলেও বাস্তবে পরিস্থিতি ক্রমেই কঠোর হয়েছে। মেয়েদের ষষ্ঠ শ্রেণির পর পড়াশোনা বন্ধ, বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ এবং বহু পেশায় নারীদের কাজের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ২৪ লাখ আফগান কিশোরী মাধ্যমিক শিক্ষার বাইরে রয়েছে। আফগানিস্তানই বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় আনুষ্ঠানিকভাবে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের পাশাপাশি নারীদের স্বাভাবিক চলাফেরার ওপরও নানা বিধিনিষেধ রয়েছে। জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেনের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, জরিপে অংশ নেওয়া আফগান নারীদের অর্ধেকেরও বেশি মাসে মাত্র এক বা দুইবার বাড়ির বাইরে বের হন। প্রায় ৭০ শতাংশ নারী নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা খারাপ বা খুব খারাপ বলে জানিয়েছেন।
জাতিসংঘ বলছে, তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর নারীদের অধিকার সীমিত করে ১০০টিরও বেশি ডিক্রি জারি করেছে। এসব বিধিনিষেধ শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, চলাচল ও বিচার পাওয়ার সুযোগসহ নারীদের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করছে।
আফগান নারীদের অনেকেই বলছেন, তালেবান শাসনের পাঁচ বছরে তাদের জীবন ক্রমেই ঘরের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ হারিয়ে অনেক তরুণী অনলাইন কোর্স, ঘরে বসে ছোটখাটো কাজ কিংবা গোপনে পড়াশোনার ওপর নির্ভর করছেন।
সাম্প্রতিক একাধিক প্রতিবেদনে আফগান নারীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে—তারা শুধু শিক্ষা বা চাকরি হারাননি, বরং সমাজে নিজেদের পরিচয় ও স্বাধীনতাও হারানোর অনুভূতিতে ভুগছেন। কেউ সাবেক শিক্ষার্থী, কেউ সাংবাদিক, কেউ শিক্ষক বা স্বাস্থ্যকর্মী ছিলেন। তালেবানের বিধিনিষেধের কারণে তাদের অনেকেই এখন নিজেদের পেশা থেকে বিচ্ছিন্ন।
তালেবান সরকার অবশ্য নারীদের অধিকার পুরোপুরি অস্বীকার করার কথা বলে না। তাদের দাবি, ইসলামি আইন ও আফগান সংস্কৃতির নিজস্ব ব্যাখ্যার ভিত্তিতেই নারীদের জন্য এসব নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। তালেবান নেতারা নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দীর্ঘদিনের যুদ্ধের অবসানকে তাদের শাসনের বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরছেন।
তবে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার মতে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির কিছু উন্নতি হলেও নারীদের ওপর চলমান বিধিনিষেধ আফগানিস্তানের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা আফগান নারীদের পরিস্থিতিকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুতর নারী অধিকার সংকটগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তালেবান সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত থাকলেও গত পাঁচ বছরে তাদের নারী নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং একই সময়ে বিভিন্ন দেশ নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও অভিবাসন ইস্যুতে তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। এ কারণে মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে—আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার প্রক্রিয়ায় নারীদের অধিকার প্রশ্নটি গুরুত্ব হারাচ্ছে কি না।
১৪ আগস্ট জাতিসংঘ জানায়, ৫৬টি দেশ তালেবানের কাছে নারী ও মেয়েদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইউএন উইমেন সতর্ক করেছে, অর্থায়নের সংকটে আফগান নারীদের নিয়ে কাজ করা বহু সংগঠন আগামী এক বছরের মধ্যে কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে।
২০২১ সালে তালেবান কাবুল দখলের পর আফগান নারীদের অনেকেই আশা করেছিলেন, আগের শাসনামলের কঠোরতার পুনরাবৃত্তি হবে না। পাঁচ বছর পর সেই প্রত্যাশার জায়গায় এসেছে হতাশা।
সূত্র: এপি নিউজ
আরও পড়ুন:







