News Ticker
221.png

শিশুহত্যার অভিযোগে ফাঁসি, ১১৯ বছর পর উঠল নতুন প্রশ্ন

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ আগস্ট, ২০২৬ ২১:৫৮

শেয়ার

শেয়ার

শিশুহত্যার অভিযোগে ফাঁসি, ১১৯ বছর পর উঠল নতুন প্রশ্ন
ছবি: সংগৃহীত

১১৯ বছর আগে শিশুহত্যার অভিযোগে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল এক নারীকে। ওয়েলসের ইতিহাসে ফাঁসিতে ঝোলানো শেষ নারী হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়া সেই নারী পরিচিত ছিলেন লেসলি জেমস নামে। তবে তাঁর আসল নাম ছিল রোডা উইলিস। মৃত্যুর এত বছর পর নতুন করে তাঁর জীবন ও মামলার নথি ঘেঁটে প্রশ্ন উঠেছে—তিনি কি সত্যিই পরিকল্পিতভাবে শিশুটিকে হত্যা করেছিলেন, নাকি তাঁর মানসিক ও শারীরিক অবস্থার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদালতে যথাযথভাবে বিবেচিত হয়নি?

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনের সূত্র ধরে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তাঁর জীবন ও মামলাকে ঘিরে লেখা বইয়েও দাবি করা হয়েছে, উইলিসের অতীত, মাথায় গুরুতর আঘাত এবং মদ্যপানের সমস্যার মতো বিষয়গুলো তাঁর বিচারপ্রক্রিয়ায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

লেসলি জেমস নামে পরিচিত নারীটির প্রকৃত নাম ছিল রোডা উইলিস। তিনি ইংল্যান্ডের সান্ডারল্যান্ডে জন্মেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে ওয়েলসে বসবাস শুরু করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি ‘লেসলি জেমস’ নামটি ব্যবহার করতে শুরু করেন।

১৯০৭ সালে তিনি নবজাতক শিশু দেখাশোনা বা ‘baby-farming’-এর সঙ্গে যুক্ত হন। সে সময় দরিদ্র বা অবিবাহিত মায়েরা অর্থের বিনিময়ে তাঁদের সন্তান অন্যের কাছে তুলে দিতেন। এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে অনেকেই শিশু লালন-পালনের দায়িত্ব নিতেন।

উইলিসের ক্ষেত্রেও এমন একটি ঘটনা ঘটে। তিনি এক নবজাতককে তার মায়ের কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে নিজের তত্ত্বাবধানে নেন। পরে শিশুটির মৃত্যু হয় এবং উইলিসের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনা হয়।

ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, ১৯০৭ সালের জুনে উইলিস মা'ড ট্রেজারের এক নবজাতক শিশুকে নিজের দায়িত্বে নেন। শিশুটিকে নিয়ে তিনি কার্ডিফের দিকে ফেরার পথে ছিলেন।

অভিযোগ ছিল, ট্রেনে শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। পরে শিশুটির মরদেহ পাওয়া গেলে পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং উইলিসকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মামলায় প্রসিকিউশনের মূল বক্তব্য ছিল—শিশুটিকে দেখাশোনার দায়িত্ব নেওয়ার বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করেছিলেন উইলিস এবং পরে শিশুটিকে হত্যা করেছিলেন। আদালতে তাঁকে হত্যার জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

রোডা উইলিসকে ১৪ আগস্ট ১৯০৭ সালে কার্ডিফ কারাগারে ফাঁসি দেওয়া হয়। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, তিনিই ছিলেন ২০ শতকে ওয়েলসে ফাঁসি হওয়া একমাত্র নারী এবং ওয়েলসে ফাঁসি হওয়া সর্বশেষ নারী।

অর্থাৎ তাঁর মৃত্যুর পর পেরিয়ে গেছে প্রায় ১১৯ বছর। কিন্তু এতদিন পর তাঁর বিচার নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠছে।

নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে উইলিসের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—তাঁর মাথায় গুরুতর আঘাতের ইতিহাস।

লেখক রজার গ্রিফিন তাঁর বই The Unrespectable Woman-এ উইলিসের জীবন ও মামলাকে পুনর্বিবেচনা করেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণা করে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, আদালতে উইলিসকে শুধু একজন শিশুহত্যাকারী হিসেবে দেখা হয়েছিল কি না।

গ্রিফিনের গবেষণায় উঠে আসে, উইলিস জীবনের একটি পর্যায়ে মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন। এর পর তাঁর আচরণ ও জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায় বলে লেখকের দাবি। তিনি মদ্যপানের সমস্যায়ও জড়িয়ে পড়েন।

লেখকের মতে, এসব বিষয় তাঁর মানসিক অবস্থা ও আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত। কিন্তু সে সময়ের বিচারব্যবস্থায় এগুলো আজকের মতো করে বিশ্লেষণ বা গুরুত্ব পাওয়ার সুযোগ ছিল না।

উইলিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি শিশুটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছেন। ঐতিহাসিক রেকর্ডে তাঁকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করার কথা রয়েছে। তবে নতুন গবেষণা মামলার পরিস্থিতি, তাঁর জীবন এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ তৈরি করেছে।

গ্রিফিন নিজেও সরাসরি দাবি করছেন না যে আদালতের রায় নিশ্চিতভাবেই ভুল ছিল। বরং তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, উইলিস আদৌ ন্যায়সংগত বিচার পেয়েছিলেন কি না এবং তাঁর মানসিক ও সামাজিক পরিস্থিতি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল কি না।

বইটি ঐতিহাসিক কল্পকাহিনি ও গবেষণার সমন্বয়ে তৈরি হলেও লেখক মামলাটির পেছনে দীর্ঘ সময় গবেষণা করেছেন। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, প্রায় পাঁচ-ছয় বছর ধরে এ বিষয়ে গবেষণা করেছেন।

উইলিসের মামলাটি বুঝতে হলে ১৯০৭ সালের ব্রিটিশ সমাজব্যবস্থার কথাও মনে রাখতে হবে।

সে সময় স্বামীহারা, দরিদ্র ও মদ্যপানে আক্রান্ত নারীদের সামাজিক অবস্থান ছিল অত্যন্ত দুর্বল। অবিবাহিত মায়েদের সন্তান জন্ম দেওয়াও সামাজিকভাবে কলঙ্কজনক হিসেবে দেখা হতো। অন্যদিকে শিশুর যত্নের নামে অর্থ লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ‘baby-farming’ ব্যবস্থা নিয়েও সমাজে ব্যাপক বিতর্ক ছিল।

উইলিসের বিরুদ্ধে মামলায় শুধু শিশুটির মৃত্যুই নয়, তাঁর জীবনযাপন, মদ্যপান এবং অর্থের বিনিময়ে শিশু গ্রহণের বিষয়গুলোও নেতিবাচকভাবে উপস্থাপিত হয়েছিল।

একটি গবেষণামূলক গবেষণাপত্রে তাঁর মামলার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রসিকিউশন তাঁকে অর্থের জন্য শিশু গ্রহণ এবং পরে তাদের ‘সরিয়ে দেওয়ার’ পরিকল্পনাকারী হিসেবে উপস্থাপন করেছিল।

রজার গ্রিফিনের গবেষণার অন্যতম মূল বক্তব্য হলো—উইলিসকে তাঁর সময়ের সামাজিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা হয়েছিল।

লেখকের মতে, স্বামীর মৃত্যু, মাথায় আঘাত, মদ্যপানের সমস্যা, দারিদ্র্য এবং একজন একাকী নারী হিসেবে তাঁর সীমিত সুযোগ—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর জীবনের একটি জটিল বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল।

গ্রিফিনের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর বইয়ের উদ্দেশ্য শুধু পুরোনো একটি হত্যাকাণ্ডের রহস্য সমাধান করা নয়; বরং সেই সময়ের সমাজ কীভাবে একজন নারীকে বিচার করত, সেটিও তুলে ধরা।

ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ আছে, মৃত্যুর ঠিক আগে উইলিস তাঁর আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছিলেন এবং শিশুটির মৃত্যুর বিষয়ে নিজের বক্তব্য দিয়েছিলেন। কিছু পুরোনো প্রতিবেদনে তাঁর স্বীকারোক্তির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব বক্তব্যের প্রকৃতি ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ফলে ১১৯ বছর পর মামলাটি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তোলার ক্ষেত্রে পুরোনো নথি, সাক্ষ্য এবং সেই সময়কার সংবাদ প্রতিবেদনগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রোডা উইলিসের মামলা শুধু একটি শিশুহত্যার মামলা নয়। এটি ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থা, নারী অধিকার, দারিদ্র্য এবং ২০ শতকের শুরুতে নারীদের সামাজিক অবস্থার একটি প্রতিচ্ছবিও।

তিনি ছিলেন ওয়েলসে ফাঁসি হওয়া শেষ নারী। একই সঙ্গে তিনি ব্রিটেনে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ‘baby-farmer’দের মধ্যে সর্বশেষদের একজন ছিলেন। তাঁর মামলা নিয়ে পরবর্তী গবেষণা তাই শুধু অপরাধের সত্যতা নয়, সেই সময়কার সমাজ ও বিচারব্যবস্থার চরিত্র নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে।

রোডা উইলিস ওরফে লেসলি জেমসের ফাঁসি হয়ে গেছে ১১৯ বছর আগে। আইনের চোখে তিনি ছিলেন শিশুহত্যার দায়ে দণ্ডিত একজন অপরাধী।

ChannelNRB Footer