যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আবারও তীব্র তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে। দেশটির মধ্যাঞ্চল থেকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত প্রায় ৯ কোটি ৭০ লাখ মানুষ বিপজ্জনক গরমের ঝুঁকিতে রয়েছেন। ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস (NWS) এক ডজনের বেশি অঙ্গরাজ্যে তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি করেছে।
আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (প্রায় ৩৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ছাড়াতে পারে। এর সঙ্গে উচ্চ আর্দ্রতা যোগ হওয়ায় কিছু এলাকায় তাপমাত্রা অনুভূত হতে পারে ১১৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো।
তাপপ্রবাহের সবচেয়ে তীব্র প্রভাব পড়ছে সাদার্ন প্লেইনস, লোয়ার মিসিসিপি ভ্যালি এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায়। উচ্চচাপের একটি বৃহৎ বলয় বা ‘হিট ডোম’ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ওপর অবস্থান করায় ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি তাপ ও আর্দ্রতা আটকে থাকছে। ফলে কয়েক দিন ধরে অস্বাভাবিক গরম পরিস্থিতি বজায় থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শুধু দিনের গরমই নয়, রাতের তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকতে পারে। অনেক এলাকায় রাতের তাপমাত্রা ৭০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের নিচে নামবে না বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ফলে শরীর রাতে পর্যাপ্ত সময় ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ না পাওয়ায় তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার সময়েই এই তীব্র তাপপ্রবাহ আঘাত হেনেছে। অতিরিক্ত গরমের কারণে স্কুল ও ক্রীড়া কার্যক্রমে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। কিছু এলাকায় শিক্ষার্থীদের বাইরের কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে এবং পর্যাপ্ত পানি পান ও শরীর ঠান্ডা রাখার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্যও পরিস্থিতি বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘ সময় সরাসরি রোদ ও উচ্চ তাপমাত্রায় কাজ করলে পানিশূন্যতা, হিট ক্র্যাম্প, হিট এক্সহসশন এবং গুরুতর ক্ষেত্রে হিটস্ট্রোক হতে পারে।
সাম্প্রতিক এই তাপপ্রবাহ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র সদ্য তার ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ জুলাই পার করেছে। ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NOAA)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সংলগ্ন ৪৮ অঙ্গরাজ্যের গড় তাপমাত্রা ছিল ৭৬ দশমিক ৮৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট (২৪ দশমিক ৯৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস)—১৮৯৫ সালে রেকর্ড সংরক্ষণ শুরুর পর জুলাই মাসের সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার প্রবণতার সঙ্গে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ বাড়ায় দীর্ঘ ও তীব্র তাপপ্রবাহের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
প্রচণ্ড গরমের সময় বিশেষজ্ঞরা অপ্রয়োজনে বাইরে না থাকা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং সম্ভব হলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বা ঠান্ডা স্থানে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যায় থাকা ব্যক্তিদের বাড়তি সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বাইরে কাজ করতে হলে নিয়মিত বিরতি নেওয়া, ছায়ায় থাকা এবং শরীরে পানির ঘাটতি হতে না দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন এলাকায় কুলিং সেন্টার বা ঠান্ডা পরিবেশে আশ্রয়ের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এই তাপপ্রবাহ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঞ্চলে আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিপজ্জনক গরম পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে আগামী কয়েক দিন দেশটির লাখ লাখ মানুষের জন্য চরম সতর্কতার সময় হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: এপি নিউজ
আরও পড়ুন:







