News Ticker
221.png

আমদানি নির্ভরতা বাড়ায় জলবায়ু ঝুঁকিতে যুক্তরাজ্যের খাদ্যদাম

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট, ২০২৬ ১৪:২৭

শেয়ার

শেয়ার

আমদানি নির্ভরতা বাড়ায় জলবায়ু ঝুঁকিতে যুক্তরাজ্যের খাদ্যদাম
ছবি: সংগৃহীত

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় যুক্তরাজ্যে খাদ্যের দাম আরও বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে ফল ও সবজির আমদানিনির্ভরতা বেশি হওয়ায় বিদেশে খরা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও পানির সংকটের মতো জলবায়ুজনিত দুর্যোগ সরাসরি ব্রিটিশ ভোক্তাদের খাদ্য ব্যয়ে প্রভাব ফেলতে পারে।

খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা ফুড ফাউন্ডেশন বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সতর্ক করেছে, যুক্তরাজ্য তার মোট খাদ্যের প্রায় ৪০ শতাংশ আমদানি করে। তবে ফল ও সবজির ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা আরও বেশি—দেশটির প্রায় ৮০ শতাংশ ফল এবং ৪৭ শতাংশ সবজি বিদেশ থেকে আসে। ফলে প্রধান উৎপাদনকারী দেশগুলোতে জলবায়ুজনিত বিপর্যয় দেখা দিলে সরবরাহ কমে গিয়ে দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ফুড ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে স্বাস্থ্যকর খাদ্যপণ্য সরবরাহকারী শীর্ষ ২০টি দেশের মধ্যে ১৮টি দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মাঝারি থেকে গুরুতর ঝুঁকিতে রয়েছে। এর অর্থ হলো, একাধিক সরবরাহকারী দেশে একই সময়ে ফসলের ক্ষতি হলে ব্রিটিশ আমদানিকারকদের বিকল্প উৎস খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

স্পেন, দক্ষিণ আফ্রিকা, চিলি, মরক্কো ও ইসরায়েলের মতো দেশ থেকে যুক্তরাজ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফল ও সবজি আসে। এসব অঞ্চলের কিছু এলাকায় পানির সংকট ও খরার ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে উৎপাদন ব্যাহত হলে যুক্তরাজ্যের বাজারে সরবরাহ ঘাটতি এবং মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিতে পারে।

যুক্তরাজ্য শস্য, মাংস, দুধ ও ডিম উৎপাদনে তুলনামূলকভাবে স্বনির্ভর হলেও ফল ও সবজির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। দেশের বাজারে প্রয়োজনীয় অনেক ফলের বড় অংশই বিদেশ থেকে আসে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আপেল, স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, রাস্পবেরি ও নাশপাতির মতো ফল যুক্তরাজ্যেই আরও বেশি পরিমাণে উৎপাদন করা সম্ভব। কিন্তু এসব ফলের কয়েকটির ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদন মোট চাহিদার ৪০ শতাংশেরও কম পূরণ করে।

সবজির ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। গাজরের প্রায় ৯৪ শতাংশ চাহিদা দেশীয় উৎপাদন থেকে পূরণ হলেও টমেটো, মাশরুম, মরিচ, শসা, পেঁয়াজ, ব্রকলি ও গ্রিন বিনের ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদন মোট চাহিদার প্রায় অর্ধেক পূরণ করে।

শুধু বিদেশি সরবরাহের ওপর নির্ভরতা নয়, যুক্তরাজ্যের নিজস্ব কৃষিও জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক আবহাওয়া, অতিবৃষ্টি ও দাবানলের মতো চরম আবহাওয়া কৃষি উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

২০২৫ সালে যুক্তরাজ্যের তাজা সবজি সরবরাহের ৫৬ শতাংশ দেশীয় উৎপাদন থেকে এসেছে। কৃষকেরা দীর্ঘ সময়ের শুষ্ক আবহাওয়া ও পানির প্রাপ্যতাকে উৎপাদনের বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এদিকে জলবায়ুজনিত ধাক্কার প্রভাব শুধু ফল ও সবজিতে সীমাবদ্ধ নয়। চলতি বছর প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে খরা, অতিরিক্ত তাপ ও অতিবৃষ্টির মতো চরম আবহাওয়া ইতোমধ্যে ভেড়ার মাংসের উৎপাদন ও দামে প্রভাব ফেলেছে।

কোনো একটি বড় সরবরাহকারী দেশে ফসল নষ্ট হলে আমদানিকারকরা অন্য দেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করতে পারেন। কিন্তু একাধিক দেশে একই সময়ে জলবায়ুজনিত দুর্যোগ দেখা দিলে সেই বিকল্পও সীমিত হয়ে যেতে পারে। তখন আমদানিকারকদের ক্রয়মূল্য বাড়বে এবং সেই অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত সুপারমার্কেটের দামে যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এর ফলে ইতোমধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে চাপে থাকা পরিবারগুলোর ওপর নতুন করে আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যকর খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ফল ও সবজির দাম বাড়লে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের খাদ্যাভ্যাসেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাজ্যের জন্য আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে যেসব খাদ্য দেশে উৎপাদন করা সম্ভব, সেগুলোর উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো যেতে পারে।

দেশটির সরকারও খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষির স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। আধুনিক গ্রিনহাউস, উন্নত সেচব্যবস্থা, সাশ্রয়ী জ্বালানি, পর্যাপ্ত পানি এবং কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে দেশীয় ফল ও সবজির উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

ফুড ফাউন্ডেশনের সতর্কবার্তার মূল বক্তব্য হলো—জলবায়ু পরিবর্তন এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি খাদ্য সরবরাহ ও মানুষের দৈনন্দিন বাজার খরচের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে জলবায়ু সহনশীল দেশীয় কৃষি গড়ে তুলতে না পারলে ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্যের ভোক্তাদের খাদ্যদাম আরও ঘন ঘন জলবায়ুজনিত ধাক্কার মুখে পড়তে পারে।

সূত্র: দা ডেইলি ডেজলিং ডন

ChannelNRB Footer