যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করলে সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইরান ইউরোপে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলার সম্ভাবনা বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস (FT)।
বুধবার (১৯ আগস্ট) প্রকাশিত প্রতিবেদনে ইরানি সরকারের ঘনিষ্ঠ দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, ওয়াশিংটন নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করলে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়ে তেহরান সম্ভাব্য বিকল্পগুলো পর্যালোচনা করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় ইউরোপের কয়েকটি মার্কিন সামরিক সম্পদ রয়েছে। বিশেষ করে বুলগেরিয়া ও সাইপ্রাসের নাম উঠে এসেছে। বুলগেরিয়া গত মাসে মার্কিন রিফুয়েলিং উড়োজাহাজের জন্য দেশটির বেজমের বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। অন্যদিকে সাইপ্রাসে একটি ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি মার্চে ড্রোন হামলার শিকার হয়েছিল।
ইরানের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র যদি সংঘাতকে ‘খুব বেশি দূর’ নিয়ে যায়, তাহলে তেহরান মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে গিয়েও পাল্টা জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে পারে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় সামরিক অবকাঠামোও ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধের আওতায় আসতে পারে।
ইরানের এমন অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটকে আরও আন্তর্জাতিক রূপ দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ ইউরোপের কোনো ন্যাটো সদস্যদেশে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা হলে সেটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ন্যাটোর প্রতিরক্ষা কাঠামোর ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
ইরানের সম্ভাব্য হামলার খবরের পর ন্যাটো জানিয়েছে, তারা যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুত। ন্যাটোর এক কর্মকর্তা বলেন, জোটটি সব মিত্রকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এর আগে চলতি বছর ইরান থেকে তুরস্কের দিকে ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কয়েক দফা ন্যাটোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করেছিল বলেও উল্লেখ করা হয়।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে উত্তেজনা দ্রুত বেড়েছে। জুনে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও বৃহত্তর সমঝোতার পথ তৈরির লক্ষ্যে একটি সমঝোতা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চুক্তি কার্যকর না হওয়ায় সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায়।
ট্রাম্পও ইরানের সঙ্গে নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। ১৮ আগস্ট তিনি জানান, তেহরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা বৈঠক নির্ধারিত নেই। একই সময়ে ইরান জানিয়েছে, তারা প্রয়োজনে আরও আক্রমণাত্মক সামরিক অবস্থানে যেতে প্রস্তুত।
সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটির স্বাভাবিক চলাচল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তীব্র বিরোধ চলছে। ইরান বলছে, তাদের দাবিগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রণালির ওপর বিধিনিষেধ অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন প্রণালিটি পুনরায় উন্মুক্ত করার জন্য তেহরানের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
এর মধ্যেই ট্রাম্প ওমানের বিরুদ্ধেও সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। ইরানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালির নৌ-চলাচল নিয়ে ওমানের আলোচনায় ওয়াশিংটনের অসন্তোষ থেকেই এ হুমকি এসেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানের ইউরোপমুখী সম্ভাব্য হামলার বিষয়টি এখনো বাস্তবে হামলা শুরু হওয়ার ঘোষণা নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ আরও বাড়ালে কী ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, সেই সম্ভাব্য সামরিক বিকল্পগুলোর একটি হিসেবে ইউরোপে মার্কিন স্থাপনাকে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে।
তবে এমন কোনো হামলা বাস্তবে ঘটলে তা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে ইউরোপের নিরাপত্তা সংকটেও পরিণত করতে পারে। বিশেষ করে ন্যাটো সদস্যদেশে মার্কিন সামরিক স্থাপনা আক্রান্ত হলে সংঘাতের পরিধি দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে ন্যাটোর পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে স্পষ্ট করা হয়েছে—জোটটি যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুত। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং তেহরানের প্রতিক্রিয়ার ওপরই এখন অনেকটাই নির্ভর করছে সংঘাতটি কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ইউরোপ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে।
সূত্র: রয়টার্স
আরও পড়ুন:







