যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করে, তাহলে তেহরানও তার জবাব একই ধরনের অস্ত্র দিয়ে দেওয়ার কথা বিবেচনা করবে—এমন কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কমিটির সদস্য ফাদা হোসেইন মালেকি।
ইরানি সংবাদমাধ্যম ‘খাবার অনলাইন’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মালেকি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে এমন কোনো ‘অবিবেচনাপ্রসূত’ পদক্ষেপ নিতে পারেন—এ সম্ভাবনা তিনি পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছেন না। তবে তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র এমন পদক্ষেপ নেওয়ার সাহস করবে না, কারণ এতে বিশ্ব একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
মালেকির বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে, তাহলে ইরানও পাল্টা জবাব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে। তাঁর মন্তব্যটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে এসেছে—পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করলে সংঘাতের পরিণতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মালেকির বক্তব্য ইরান সরকারের আনুষ্ঠানিকভাবে পরমাণু হামলার সিদ্ধান্ত ঘোষণা নয়। তিনি ইরানের পার্লামেন্টের একজন সদস্য এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কমিটির সদস্য হলেও তাঁর মন্তব্যকে সরাসরি রাষ্ট্রীয় সামরিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাত সাম্প্রতিক সময়ে আরও উত্তপ্ত হয়েছে। ১৭ আগস্ট ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে তেহরান ‘পূর্ণ আক্রমণাত্মক’ সামরিক অবস্থানে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌ অবরোধ ভাঙতে ইরান ‘সময়োপযোগী ও নির্ভুল’ সামরিক হামলার কথা বিবেচনা করছে বলে ওই কর্মকর্তা জানান।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত কমাতে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা হলেও সেটি স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে রূপ নেওয়ার পথে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ—এসব বিষয় নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান এখনও পরস্পরবিরোধী।
বর্তমান সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্র হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি হওয়ায় এই নৌপথে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থান এখনও সাংঘর্ষিক। একই সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনাও অব্যাহত রয়েছে।
ইরানের সর্বশেষ হুঁশিয়ারি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিরোধ তীব্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইরানকে পরমাণু অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না। অন্যদিকে তেহরান সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সংঘাত যদি প্রচলিত অস্ত্রের লড়াই থেকে পারমাণবিক পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তাহলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এতে বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা, জ্বালানি বাজার ও অর্থনীতিতে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
মালেকির বক্তব্যকে আপাতত ‘পারমাণবিক হামলার বিরুদ্ধে পাল্টা হুমকি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করলে ইরান কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে—সেই সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
এটি ইরানের পক্ষ থেকে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের তাৎক্ষণিক ঘোষণা নয়। তবে এমন বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের ঝুঁকি এবং দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক উত্তেজনার মাত্রা যে আরও বেড়েছে, সেটিই স্পষ্ট করছে।
সূত্র: রয়টার্স
আরও পড়ুন:







