ইরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক চাপ তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে নতুন ও কঠোর অভিযান চালানোর কথা জানিয়ে তিনি সতর্ক করেছেন—ইরানকে আর্থিক বা বাণিজ্যিকভাবে সহায়তা করা যেকোনো দেশ, প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যবসাকে ‘ব্যাপক অর্থনৈতিক পরিণতি’র মুখে পড়তে হতে পারে।
বুধবার দেওয়া এক ঘোষণায় ট্রাম্প তাঁর নতুন উদ্যোগকে “সর্বকালের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক অভিযান” হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি এটিকে নজিরবিহীন মাত্রার ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ট্রাম্পের ঘোষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—নতুন চাপ শুধু ইরানের ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে টিকিয়ে রাখতে কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠান ‘আর্থিক লাইফলাইন’ বা সহায়তার পথ খুলে দিলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, বিমানবন্দর বা সরকারি সংস্থা ইরানকে সহায়তা করলে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে কঠোর অর্থনৈতিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হতে পারে। তবে ঠিক কী ধরনের শাস্তি বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে, তা তিনি বিস্তারিত জানাননি।
ইরানের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক আয়ের উৎস তেল রপ্তানিকে ঘিরে নতুন চাপের ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। তেল পাচার, মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা, নগদ অর্থ স্থানান্তর, এক্সচেঞ্জ হাউস, জাহাজ নিবন্ধন এবং কথিত ফ্রন্ট কোম্পানির মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরানের ওপর থাকা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার পথ বন্ধ করার দিকে নজর দিতে পারে ওয়াশিংটন।
তবে এসবের কিছু বিষয় সম্ভাব্য পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে আলোচনায় এসেছে; ট্রাম্পের ঘোষণায় প্রতিটি ব্যবস্থার বিস্তারিত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি।
নতুন মার্কিন পদক্ষেপের সম্ভাব্য বড় প্রভাব পড়তে পারে ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের ওপর। ইরানের তেল বাণিজ্যের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক থাকায় ওয়াশিংটনের নতুন ‘সেকেন্ডারি’ বা পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞার আওতায় চীনা প্রতিষ্ঠান পড়বে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা ও চাপ প্রয়োগ কোনো সমস্যার সমাধান করে না। বেইজিং কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক তেলবাজারে এরই মধ্যে চাপ তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্পের নতুন অর্থনৈতিক অভিযানের ঘোষণার পর তেলের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। বিভিন্ন বাজার প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৯৪ ডলারে এবং মার্কিন WTI অপরিশোধিত তেলের দাম ৮৭ ডলারের ওপরে উঠেছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত প্রায় ছয় মাসে গড়ানোর প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের নতুন ঘোষণা এসেছে। সামরিক চাপের পাশাপাশি এবার ইরানের অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে আনাই ওয়াশিংটনের অন্যতম লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার পরিস্থিতি নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যও রয়েছে। ট্রাম্প একদিকে আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ইঙ্গিত দিয়েছেন, অন্যদিকে তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
ট্রাম্পের হুমকি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে এসব পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থ চাপ প্রয়োগের নীতিরই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখানো হয়েছে। ইরান মার্কিন অর্থনৈতিক চাপকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ বলেও সমালোচনা করেছে এবং দাবি করেছে, এ ধরনের চাপ দেশটির অবস্থান দুর্বল করতে পারবে না।
বিশ্লেষকদের বড় উদ্বেগ হলো, ইরানের পাশাপাশি দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকা তৃতীয় দেশগুলোর ওপরও যদি কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, তাহলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে তেল সরবরাহ, জাহাজ চলাচল, ব্যাংকিং ও আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনে বিধিনিষেধ বাড়লে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব পরিবহন ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক বাজারেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ট্রাম্পের ঘোষণার পর এখন মূল প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কী ধরনের নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কার্যকর করবে এবং সেগুলো ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর কতটা প্রয়োগ করা হবে।
ইরান, চীন ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির প্রতিক্রিয়ার ওপরও পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ অনেকাংশে নির্ভর করবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ও আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে কি না, সেটিও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের নতুন ঘোষণায় ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত সামরিক ক্ষেত্রের পাশাপাশি আরও বড় পরিসরে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স
আরও পড়ুন:







