ভাবুন তো—একটি শিশু জন্ম নিল, অথচ তার ভ্রূণটি হিমায়িত অবস্থায় সংরক্ষিত ছিল ২৪ বছরেরও বেশি সময়! এমনই বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছিল যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসিতে। এমা রেন গিবসন নামের শিশুটি ২০১৭ সালের ২৫ নভেম্বর জন্ম নেয় এমন একটি ভ্রূণ থেকে, যা ১৯৯২ সালের ১৪ অক্টোবর হিমায়িত করা হয়েছিল। সবচেয়ে অবাক করার বিষয়, ভ্রূণটি তৈরি হওয়ার সময় এমার জন্মদাত্রী মা টিনা গিবসনের বয়স ছিল মাত্র দেড় বছর।
এমার বাবা-মা বেঞ্জামিন ও টিনা গিবসন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব টেনেসিতে বসবাস করেন। সন্তান ধারণে সমস্যার কারণে তারা প্রচলিত দত্তক নেওয়ার কথা ভাবছিলেন। পরে তারা ভ্রূণ দত্তক নেওয়ার বিষয়ে জানতে পারেন।
ভ্রূণ দত্তক বা embryo adoption-এর ক্ষেত্রে আইভিএফের মাধ্যমে তৈরি অতিরিক্ত ভ্রূণগুলো ধ্বংস না করে হিমায়িত অবস্থায় সংরক্ষণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে সন্তান ধারণে ইচ্ছুক অন্য কোনো দম্পতির কাছে সেই ভ্রূণ হস্তান্তর করা যেতে পারে।
২০১৬ সালে গিবসন দম্পতি টেনেসির নক্সভিলের ন্যাশনাল এমব্রিও ডোনেশন সেন্টার (NEDC)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরবর্তী সময়ে তাদের জন্য দাতাদের ভ্রূণের বিভিন্ন তথ্য ও প্রোফাইল দেখানো হয়। সেখান থেকে তারা একটি ভ্রূণ নির্বাচন করেন।
তখনও তারা জানতেন না, নির্বাচিত ভ্রূণটি প্রায় ২৪ বছর ধরে হিমায়িত অবস্থায় রয়েছে।
এমার ভ্রূণটি ১৯৯২ সালের ১৪ অক্টোবর তৈরি ও হিমায়িত করা হয়েছিল। প্রায় সাড়ে ২৪ বছর পর, ২০১৭ সালের মার্চে ভ্রূণটি টিনা গিবসনের জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়।
এরপর স্বাভাবিক গর্ভধারণের মতোই টিনা গর্ভাবস্থার সময় পার করেন। অবশেষে ২০১৭ সালের ২৫ নভেম্বর জন্ম নেয় এমা রেন গিবসন। জন্মের সময় তার ওজন ছিল প্রায় ৬ পাউন্ড ৮ আউন্স এবং দৈর্ঘ্য ছিল ২০ ইঞ্চি।
এমার বয়সের বিষয়টি জানতে পেরে তার মা টিনা নিজেই বিস্মিত হয়ে যান। কারণ, ভ্রূণটি যখন তৈরি হয়েছিল, তখন তিনিও ছিলেন শিশু।
টিনা বলেছিলেন, ভ্রূণটি যদি তখনই জন্ম নিত, তাহলে তার সঙ্গে এমার বয়সের ব্যবধান খুবই কম হতো—এমনকি তারা প্রায় বন্ধুর মতো বয়সী হতে পারতেন। এই অদ্ভুত সময়ের ব্যবধানই ঘটনাটিকে আরও আলোচিত করে তোলে।
আইভিএফ বা ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন পদ্ধতিতে শরীরের বাইরে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলনে ভ্রূণ তৈরি করা হয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভ্রূণগুলো বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় হিমায়িত করে রাখা যায়।
এ ধরনের সংরক্ষণকে cryopreservation বলা হয়। প্রয়োজন হলে ভ্রূণকে গলিয়ে বা thaw করে নারীর জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়।
এমার ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা ১৯৯২ সালে তৈরি ভ্রূণটি দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের পর সফলভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম হন। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের কাছে ঘটনাটি ছিল দীর্ঘমেয়াদি ভ্রূণ সংরক্ষণের সম্ভাবনার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
২০১৭ সালে এমার জন্মের সময় তাকে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় হিমায়িত থাকা ভ্রূণ থেকে জন্ম নেওয়া শিশু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ইউনিভার্সিটি অব টেনেসির গবেষণা-সংশ্লিষ্ট মেডিকেল লাইব্রেরির তথ্য অনুযায়ী, এর আগে এত দীর্ঘ সময় সংরক্ষিত ভ্রূণ থেকে সফল জন্মের নির্ভরযোগ্য নজির খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তবে এই রেকর্ড পরে ভেঙে যায়। ২০২০ সালে এমারই ছোট বোন মলি গিবসন এমন একটি ভ্রূণ থেকে জন্ম নেয়, যা প্রায় ২৭ বছর ধরে হিমায়িত ছিল। ফলে মলি দীর্ঘতম সময় হিমায়িত থাকা ভ্রূণ থেকে সফল জন্মের নতুন রেকর্ড গড়ে।
এমার জন্মের ঘটনা শুধু মানুষের কৌতূহলই বাড়ায়নি, ভ্রূণ দত্তক নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছিল। আইভিএফ চিকিৎসার পর অনেক দম্পতির অতিরিক্ত ভ্রূণ সংরক্ষিত থাকে। সেগুলো ভবিষ্যতে নিজেদের চিকিৎসায় ব্যবহার, গবেষণায় দান, ধ্বংস করা অথবা অন্য দম্পতির কাছে দানের মতো বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
গিবসন পরিবারের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন সংরক্ষিত একটি ভ্রূণ অন্য এক দম্পতির পরিবারে নতুন জীবনের সূচনা করে।
এমা গিবসনের জন্ম দেখিয়েছে, দীর্ঘ সময় হিমায়িত অবস্থায় থাকার পরও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একটি মানবভ্রূণ সফলভাবে বিকশিত হয়ে শিশুর জন্ম দিতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে যেকোনো ভ্রূণ অনির্দিষ্টকাল সংরক্ষণ করলেই সফলভাবে জন্ম নেওয়ার নিশ্চয়তা থাকে। ভ্রূণের গুণমান, সংরক্ষণ পদ্ধতি, thawing প্রক্রিয়া, জরায়ুর প্রস্তুতি এবং অন্যান্য চিকিৎসাগত বিষয় এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এমার গল্প তাই শুধু একটি শিশুর জন্মের গল্প নয়—এটি আইভিএফ, ভ্রূণ সংরক্ষণ এবং আধুনিক প্রজনন চিকিৎসাবিজ্ঞানের অসাধারণ সম্ভাবনারও একটি আলোচিত উদাহরণ।
সূত্র: দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট
আরও পড়ুন:







