জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব কে হবেন—এ নিয়ে প্রতিযোগিতা এখন জমে উঠেছে। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তাঁর উত্তরসূরি বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় এখন পর্যন্ত আটজন প্রার্থী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন নারী ও তিনজন পুরুষ। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার প্রায় আট দশক পর এবার প্রথমবারের মতো কোনো নারী মহাসচিব হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর দায়িত্ব ছাড়বেন। ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি নতুন মহাসচিব দায়িত্ব নেওয়ার কথা।
বর্তমান আট প্রার্থীর তালিকায় রয়েছেন—
-
রেবেকা গ্রিনস্প্যান — কোস্টারিকা
-
মিশেল ব্যাচেলেট — চিলি
-
মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসা — ইকুয়েডর
-
ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বির্কেট — গায়ানা
-
ইভোনে বাকি — ইকুয়েডর
-
রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি — আর্জেন্টিনা
-
মাকি সাল — সেনেগাল
-
ওলার ওতুনু — উগান্ডা
ইভোনে বাকি সম্প্রতি এই প্রতিযোগিতায় যোগ দিয়ে অষ্টম প্রার্থী হয়েছেন। তাঁকে টোঙ্গা মনোনয়ন দিয়েছে। তিনি ইকুয়েডরের দীর্ঘদিনের কূটনীতিক এবং বিভিন্ন দেশে দেশটির রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রার্থীদের মধ্যে প্রাথমিকভাবে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাডের (UNCTAD) মহাসচিব গ্রিনস্প্যান এর আগে কোস্টারিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
৩০ জুলাই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রথম অনানুষ্ঠানিক ‘স্ট্র পোল’-এ গ্রিনস্প্যান সবচেয়ে বেশি সমর্থন পান। কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, তিনি ১০টি ‘এনকারেজ’ ভোট পেয়েছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন গায়ানার ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বির্কেট, আর তৃতীয় হন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি।
তবে এই ভোটকে চূড়ান্ত নির্বাচন হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এটি মূলত নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের একটি গোপন প্রক্রিয়া।
প্রথম অনানুষ্ঠানিক ভোটের ফলাফলে গ্রিনস্প্যানের পর দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বির্কেটও আলোচনায় উঠে এসেছেন। গায়ানার এই কূটনীতিক দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বর্তমানে জাতিসংঘে গায়ানার স্থায়ী প্রতিনিধি। তিনি নির্বাচিত হলে জাতিসংঘের প্রথম ক্যারিবীয় এবং প্রথম নারী মহাসচিব হওয়ার ইতিহাস গড়তে পারেন।
প্রথম ভোটে রদ্রিগেস-বির্কেট নয়টি ‘এনকারেজ’ ভোট পেয়েছেন বলে কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে। তাঁর পরেই ছিলেন আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসি।
চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাচেলেটও অন্যতম আলোচিত প্রার্থী। তিনি দুই মেয়াদে চিলির প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং পরে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জাতিসংঘের প্রার্থী তালিকায় তাঁর মনোনয়ন বহাল রয়েছে, যদিও চিলির বর্তমান সরকার পরে তাঁর প্রার্থিতা থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করেছে; ব্রাজিল ও মেক্সিকোর মনোনয়ন অবশ্য রয়েছে।
প্রথম নিরাপত্তা পরিষদ ভোটে ব্যাচেলেট ছয়টি ‘এনকারেজ’ ভোট পেয়েছিলেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে পাঁচটি ‘ডিসকারেজ’ ভোটও পড়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য।
এবারের প্রতিযোগিতায় একই দেশ ইকুয়েডরের দুজন প্রার্থী রয়েছেন। তাঁরা হলেন সাবেক জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসা এবং সম্প্রতি যুক্ত হওয়া ইভোনে বাকি।
এস্পিনোসা কূটনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতার অধিকারী। তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন। অন্যদিকে বাকি ইকুয়েডরের সাবেক মন্ত্রী ও বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বাকি ২০ আগস্ট জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক অনানুষ্ঠানিক সংলাপে সংঘাত প্রতিরোধ এবং জাতিসংঘ সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামোকেও পুরোনো বলে সমালোচনা করেন।
তিন পুরুষ প্রার্থীর মধ্যে আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসি সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। তিনি বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) মহাপরিচালক। প্রথম নিরাপত্তা পরিষদের অনানুষ্ঠানিক ভোটে সাতটি ‘এনকারেজ’ ভোট নিয়ে তিনি তৃতীয় অবস্থানে ছিলেন।
সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাকি সাল এবং উগান্ডার সাবেক জাতিসংঘের আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল ওলার ওতুনুও প্রতিযোগিতায় রয়েছেন। ওতুনু ২৪ জুলাই প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হন এবং প্রথম ভোটে তুলনামূলকভাবে কম সমর্থন পেয়েছেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব সরাসরি সাধারণ ভোটে নির্বাচিত হন না। প্রক্রিয়ায় প্রথমে নিরাপত্তা পরিষদ একজন প্রার্থীকে সুপারিশ করে এবং পরে সাধারণ পরিষদ তাঁকে নিয়োগ দেয়। বর্তমান প্রক্রিয়ায় প্রার্থীদের মনোনয়ন, প্রকাশ্য সংলাপ এবং নিরাপত্তা পরিষদের অনানুষ্ঠানিক ভোটের মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রার্থী যাচাই করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স—ভেটো ক্ষমতা রাখে। ফলে কোনো প্রার্থী সাধারণ সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক সমর্থন পেলেও স্থায়ী সদস্যদের একজনের বিরোধিতা তাঁর পথ আটকে দিতে পারে।
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো নারী মহাসচিব নির্বাচিত হননি। এবারের আট প্রার্থীর মধ্যে পাঁচজন নারী থাকায় সেই দীর্ঘ ইতিহাস বদলের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গ্রিনস্প্যান ও রদ্রিগেস-বির্কেটের প্রথম দফার ভালো অবস্থানকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে শেষ পর্যন্ত কে নির্বাচিত হবেন, তা নির্ভর করবে নিরাপত্তা পরিষদের পরবর্তী দফার ভোট, পাঁচ স্থায়ী সদস্যের অবস্থান এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর।
নিরাপত্তা পরিষদে আরও কয়েক দফা অনানুষ্ঠানিক ভোট হতে পারে। প্রার্থীদের মধ্য থেকে একজনকে নিরাপত্তা পরিষদ সুপারিশ করার পর সাধারণ পরিষদে নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। বর্তমান সময়সূচি অনুযায়ী, গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি নতুন মহাসচিব দায়িত্ব নেবেন।
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক বিভাজন, জলবায়ু সংকট, মানবিক সহায়তার অর্থসংকট এবং জাতিসংঘের নিজস্ব বাজেট সংকটের মধ্যে নতুন মহাসচিবকে দায়িত্ব নিতে হবে। ফলে এবারের নির্বাচন শুধু একজন উত্তরসূরি বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়া নয়; বরং পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: রয়টার্স
আরও পড়ুন:







