যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ভয়াবহ ওষুধ সংকট দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম না পৌঁছানোয় সেখানে ৩ লাখ ৫০ হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসাসংক্রান্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
শনিবার (২২ আগস্ট) Palestinian Medical Relief Society-এর পরিচালক মোহাম্মদ আবু আফাশ এ সংকটের কথা জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, গাজায় প্রবেশ করা ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের পরিমাণ রোগীদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা প্রবেশের সুযোগ তৈরি করা না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
আবু আফাশ বলেন, গাজার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতির সঙ্গে লড়ছে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
চলমান সংকটের কারণে হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে যেসব রোগীর নিয়মিত ওষুধ সেবন জরুরি, তাদের অনেকেই চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
গাজায় ওষুধ সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষের ওপর। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগসহ বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার ক্ষেত্রে নিয়মিত ওষুধ ও চিকিৎসা প্রয়োজন। সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এসব রোগীর চিকিৎসা অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে উঠেছে।
এর আগে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওষুধের ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের জন্য বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি প্রতিবেদনে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, দীর্ঘমেয়াদি রোগের ওষুধের ঘাটতি ৬২ শতাংশে পৌঁছেছিল।
ওষুধের পাশাপাশি গাজার হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো চিকিৎসা সরঞ্জাম, জ্বালানি, জনবল ও অবকাঠামোর সংকটে রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) জুলাইয়ের সর্বশেষ HeRAMS তথ্য অনুযায়ী, গাজার স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো এখনো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা চালু রাখতে একাধিক বাধা রয়েছে।
জাতিসংঘের প্রকাশিত UNRWA প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা দীর্ঘদিনের সংঘাত, অবকাঠামো ধ্বংস, বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক সহায়তা প্রবেশে সীমাবদ্ধতার কারণে গভীর সংকটে রয়েছে। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবায় ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জ্বালানির ঘাটতিও অব্যাহত রয়েছে।
গাজার কিডনি রোগীরাও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি। চলতি আগস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে কিছু কিডনি রোগীর ডায়ালাইসিসের সময় কমিয়ে দিতে হয়েছে।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, কিডনি রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছে। নিয়মিত ডায়ালাইসিস ও চিকিৎসা না পেলে এসব রোগীর জীবন সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
গাজায় শুধু ওষুধ নয়, অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থাও সংকটে রয়েছে। ২২ আগস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার ৩৪টি অক্সিজেন উৎপাদন কেন্দ্রের মধ্যে মাত্র ১২টি চালু আছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের ঘাটতির কারণে বাকি কেন্দ্রগুলো সচল করা যাচ্ছে না।
বিশেষ করে নবজাতক, গুরুতর অসুস্থ রোগী এবং শ্বাসকষ্টে ভোগা ব্যক্তিদের জন্য এ পরিস্থিতি মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে।
গাজার চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা দ্রুত পর্যাপ্ত ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং অন্যান্য জরুরি স্বাস্থ্যসামগ্রী প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
আবু আফাশ সতর্ক করে বলেছেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা গাজায় প্রবেশ করতে না পারলে স্বাস্থ্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও গাজায় স্বাস্থ্যসেবায় নিরাপদ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা অংশীদারদের সঙ্গে মিলে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনরক্ষাকারী সরবরাহ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
গাজার স্বাস্থ্য সংকট শুধু ওষুধের ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ সংঘাতে হাসপাতাল, ক্লিনিক, অ্যাম্বুলেন্স ও চিকিৎসা অবকাঠামোর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে চিকিৎসাকর্মীর সংকট, জ্বালানি ঘাটতি, বাস্তুচ্যুতি এবং পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার বিপর্যয় স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক UNRWA প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি এবং মানবিক সহায়তা প্রবেশের সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের মতে, ওষুধের সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে গাজায় দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের পাশাপাশি শিশু, বয়স্ক, আহত এবং গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ওপর সংকটের প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
৩ লাখ ৫০ হাজারের বেশি রোগীর প্রয়োজনীয় ওষুধ নিশ্চিত করা এখন গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে যেখানে হাসপাতালগুলো সীমিত সক্ষমতায় কাজ করছে, সেখানে পর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম না পৌঁছালে প্রতিরোধযোগ্য রোগ ও জটিলতা থেকেও প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়বে।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
আরও পড়ুন:







