ইসরায়েলের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় এখন মৃতদের দাফনের জায়গাও সংকটে পড়েছে। একের পর এক কবরস্থান ধ্বংস হওয়া, বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু এবং বহু এলাকায় প্রবেশে বিধিনিষেধের কারণে স্বজনদের মরদেহ দাফন করতে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন গাজাবাসী।
দাফনের জন্য নির্ধারিত জায়গা না থাকায় অনেক মরদেহ কবরস্থানের পরিবর্তে বাগান, স্কুল, হাসপাতাল, তাঁবু এবং বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়কেন্দ্রের মতো অস্থায়ী স্থানে সমাহিত করা হয়েছে। কোথাও কোথাও পুরোনো কবর পুনরায় ব্যবহার করেও নতুন মরদেহ দাফন করতে হচ্ছে।
গাজার ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর উপত্যকাটিতে ৪০টির বেশি কবরস্থান ধ্বংস হয়েছে। যুদ্ধের আগে গাজায় প্রায় ৬০টি কবরস্থান থাকলেও দীর্ঘ সংঘাত ও ব্যাপক প্রাণহানির কারণে সেগুলোর অনেকগুলো এরই মধ্যে পূর্ণ হয়ে গেছে।
কবরস্থান ধ্বংসের পাশাপাশি নির্মাণসামগ্রীর সংকটও দাফন প্রক্রিয়াকে আরও কঠিন করে তুলেছে। অনেক জায়গায় কবর চিহ্নিত করতে পাথরের পরিবর্তে ইটের টুকরা, কাগজ, কাদা কিংবা ধ্বংস হওয়া ভবনের অংশ ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে অনেক কবরের পরিচয় সংরক্ষণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
যুদ্ধের তীব্র পর্যায়ে মরদেহ দ্রুত সরিয়ে নেওয়া ও দাফনের সুযোগ না থাকায় হাসপাতাল ও অন্যান্য অস্থায়ী স্থানে গণকবর তৈরি করা হয়েছিল। গাজার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাসপাতাল প্রাঙ্গণে থাকা সাতটি গণকবর থেকে ৫২৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। যুদ্ধবিরতির সুযোগে পরিবারগুলো এখন ধ্বংসস্তূপ বা অস্থায়ী কবর থেকে স্বজনদের মরদেহ তুলে স্থায়ী কবরস্থানে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
গত কয়েক বছরে গাজার বিভিন্ন এলাকায় গণকবরের সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় নিয়মিত কবরস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি, সেসব স্থানে একসঙ্গে বহু মরদেহ দাফন করা হয়েছে।
দাফনের সংকটের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে খান ইউনিসের একটি কবরস্থানে। কবরখোদক তাফেশ আবু হাতাবের ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে সেখানে প্রায় ৬০টি কবর ছিল। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৬ হাজারে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধের সবচেয়ে তীব্র সময়ে তাকে দিনে প্রায় ৩৫টি পর্যন্ত কবর প্রস্তুত করতে হয়েছে।
যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে বহু মানুষ ধ্বংস হওয়া ভবনের নিচে চাপা পড়েন। আবার অনেকে এমন এলাকায় মারা যান, যেখানে নিরাপত্তাজনিত কারণে উদ্ধারকারী দল বা স্বজনেরা দীর্ঘদিন যেতে পারেননি। ফলে অনেক মরদেহ দীর্ঘ সময় নিখোঁজ হিসেবে থেকে যায়।
পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর ধ্বংসস্তূপ, অস্থায়ী কবর ও অন্যান্য স্থান থেকে মরদেহ উদ্ধারের কাজ শুরু হলে নতুন করে দাফনের প্রয়োজন তৈরি হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়েও ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা মরদেহ একসঙ্গে দাফন করার ঘটনা ঘটেছে।
দাফনের জায়গার সংকটের পাশাপাশি মরদেহ শনাক্তকরণ ও কবরের পরিচয় সংরক্ষণ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। জায়গার স্বল্পতা এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাবে অনেক পরিবার স্বজনদের কবরের ওপর স্থায়ী ফলক বসাতে পারছে না।
ফলে ভবিষ্যতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান, মরদেহ শনাক্তকরণ এবং পরিবারের কাছে স্বজনের কবরের অবস্থান নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
গাজায় দাফনের জায়গার এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের বহুমাত্রিক মানবিক বিপর্যয়ের একটি নতুন দিক সামনে এনেছে। যেখানে জীবিতদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট রয়েছে, সেখানে মৃতদের জন্যও একটি নির্দিষ্ট কবরের জায়গা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও বিভিন্ন মানবিক সংস্থার সামনে এখন একদিকে ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহ উদ্ধার, অন্যদিকে সেগুলো শনাক্ত ও মর্যাদার সঙ্গে দাফনের বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা
আরও পড়ুন:







