আফ্রিকার দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআর কঙ্গো) ইবোলা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ইবোলায় নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৫ হাজার ৫১৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৬৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ইতুরি ও নর্থ কিভু প্রদেশে নতুন করে ৫১টি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) জানিয়েছে, এবারের প্রাদুর্ভাবটি ডিআর কঙ্গোর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ইবোলা প্রাদুর্ভাব। সংক্রমণের বিস্তার আগের বড় প্রাদুর্ভাবগুলোর তুলনায় দ্রুত হচ্ছে এবং নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
চলতি বছরের মে মাসে প্রাদুর্ভাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত হয়। এরপর ইটুরি থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে আরও কয়েকটি প্রদেশে। বর্তমানে দেশটির ছয়টি প্রদেশের ৫৬টি স্বাস্থ্য অঞ্চলে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে বলে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যে জানা গেছে।
এবারের প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী বুন্দিবুগিও (Bundibugyo) ভাইরাস—ইবোলা ভাইরাসের একটি বিরল ধরন। এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে বর্তমানে নির্দিষ্টভাবে অনুমোদিত কোনো টিকা বা চিকিৎসা নেই। ফলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত শনাক্তকরণ, রোগীকে আলাদা রাখা, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের নজরদারি এবং নিরাপদ চিকিৎসা ও দাফনব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, বুন্দিবুগিও ভাইরাসের এই প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি শুধু কঙ্গোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গেও মানুষের চলাচল থাকায় সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
ডিআর কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে দীর্ঘদিনের সশস্ত্র সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি এবং মানুষের ব্যাপক চলাচল ইবোলা মোকাবিলাকে আরও কঠিন করে তুলেছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের অনেক এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কর্মীদের ওপর হামলা এবং রোগ সম্পর্কে ভুল তথ্য সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের কাজে বাধা সৃষ্টি করছে।
জাতিসংঘের কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে এবং বর্তমান পর্যায়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা ও জরুরি সাড়া কার্যক্রম আরও ব্যাপকভাবে বাড়ানো প্রয়োজন।
আগস্টের মাঝামাঝি সময়েও ডিআর কঙ্গোতে ইবোলায় মৃতের সংখ্যা ২ হাজার ৩০০-এর কিছু বেশি ছিল। কয়েক দিনের মধ্যেই সেই সংখ্যা বেড়ে ২ হাজার ৬০০ ছাড়িয়েছে। এর ফলে ২০১৮–২০২০ সালের আগের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে এবারের সংক্রমণ।
তবে আক্রান্ত ও মৃতের সরকারি হিসাবের বাইরে আরও অনেক ঘটনা থেকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, বাড়িতে মৃত্যু এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করতে না পারার কারণে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। WHO-ও জানিয়েছে, অনেক মানুষ চিকিৎসাকেন্দ্রের বাইরে নিজ বাড়ি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে মারা যাচ্ছেন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় WHO, আফ্রিকা সিডিসি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা নজরদারি, রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সচেতনতা কার্যক্রম চালাচ্ছে। তবে দ্রুত বাড়তে থাকা সংক্রমণের তুলনায় এসব উদ্যোগ আরও বড় পরিসরে নেওয়া প্রয়োজন বলে সতর্ক করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালকও সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে সতর্ক করে বলেছেন, মহামারি এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি এবং সংক্রমণ ঠেকাতে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ডিআর কঙ্গোর এবারের ইবোলা প্রাদুর্ভাব ইতোমধ্যে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আকার ধারণ করেছে। আক্রান্তের সংখ্যা ৫ হাজার ৫০০ ছাড়ানো এবং মৃত্যুর সংখ্যা ২ হাজার ৬০০-এর ওপরে উঠে যাওয়ায় পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা
আরও পড়ুন:







