কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে ৪৫টি তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাংকারকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে ইরান। একই সঙ্গে এসব জাহাজের সঙ্গে সমুদ্রে পণ্য স্থানান্তরে যুক্ত অন্য জাহাজের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
সোমবার (২৪ আগস্ট) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইরানের নতুন করে গঠিত পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলেনি। এসব জাহাজের বিরুদ্ধে জরিমানা, আটক এবং পণ্য জব্দের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
ইরানের প্রকাশিত তালিকায় বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি পরিবহনকারী জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অতি বৃহৎ অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকার, এলএনজি ও এলপিজি পরিবহনকারী জাহাজ এবং পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যবাহী ট্যাংকার।
তালিকাভুক্ত কয়েকটি জাহাজ সংযুক্ত আরব আমিরাতের ADNOC Logistics & Shipping ও এর সহযোগী Navig8 Tankers-এর মালিকানাধীন। সৌদি আরবের জাতীয় শিপিং কোম্পানি Bahri-র জাহাজও রয়েছে তালিকায়। এ ছাড়া নরওয়ের Klaveness Ship Management ও Stolt Tankers এবং দক্ষিণ কোরিয়ার Sinokor-এর মালিকানাধীন জাহাজও কালো তালিকায় রয়েছে।
ইরান জানিয়েছে, কালো তালিকাভুক্ত কোনো জাহাজের সঙ্গে সমুদ্রে শিপ-টু-শিপ ট্রান্সফার বা এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে পণ্য স্থানান্তরে অংশ নিলে সংশ্লিষ্ট অন্য নৌযানও একই তালিকায় যুক্ত হতে পারে।
অর্থাৎ, ইরানের নিষেধাজ্ঞার আওতা শুধু বর্তমানে তালিকাভুক্ত ৪৫টি জাহাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এসব জাহাজের সঙ্গে বাণিজ্যিক বা কার্গো স্থানান্তরের কাজে যুক্ত অন্য জাহাজকেও সম্ভাব্য শাস্তির আওতায় আনার বার্তা দিয়েছে তেহরান।
তবে ঠিক কোন কোন নিয়ম ভঙ্গের কারণে ৪৫টি জাহাজকে ‘নন-কমপ্লায়েন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তা ইরানি কর্তৃপক্ষ বিস্তারিতভাবে জানায়নি।
এর আগে তেহরান জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজকে ইরানের কাছ থেকে ট্রানজিট অনুমোদন নিতে হবে। নিরাপত্তা ও অন্যান্য সামুদ্রিক সেবার জন্য নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধের কথাও জানিয়েছিল ইরান।
তালিকা থেকে নিজেদের নাম বাদ দিতে চাইলে সংশ্লিষ্ট জাহাজের মালিকদের প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা ও তথ্য দিয়ে ইরানের সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে।
ইরানের এই নতুন পদক্ষেপ এমন সময়ে এলো, যখন হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান Kpler-এর তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহান্তে প্রণালিটি দিয়ে খুব কমসংখ্যক পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে। রোববার মাত্র চারটি এবং শনিবার ১৩টি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করে।
২১ আগস্ট শেষ হওয়া এক সপ্তাহে ৮৯টি জাহাজ হরমুজ দিয়ে বের হয়েছে এবং ১০৩টি প্রবেশ করেছে। সংঘাতের আগের স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এই চলাচল প্রায় ৯০ শতাংশ কম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। সংঘাতের আগে বিশ্বের দৈনিক অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংকটের কারণে এই রুটে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ফলে জ্বালানি পরিবহন, বিমা ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে।
হরমুজ ঘিরে ইরানের নতুন পদক্ষেপের আগে যুক্তরাষ্ট্রও ইরান-সংশ্লিষ্ট নৌপরিবহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। একই সময়ে ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে প্রতিবেদন এসেছে।
ইরানও সতর্ক করে বলেছে, নতুন করে মার্কিন চাপ বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে তার জবাব হবে কঠোর। এর মধ্যেই ৪৫টি জাহাজকে কালো তালিকাভুক্ত করার ঘটনা হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সূত্র: রয়টার্স
আরও পড়ুন:







