News Ticker
221.png

কয়েক হাজার যৌন অপরাধীকে যৌনাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণের ওষুধ দেওয়ার পরিকল্পনা ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ আগস্ট, ২০২৬ ১৫:৩৩

শেয়ার

শেয়ার

কয়েক হাজার যৌন অপরাধীকে যৌনাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণের ওষুধ দেওয়ার পরিকল্পনা ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের
ছবি: সংগৃহীত

ধর্ষণ ও অন্যান্য গুরুতর যৌন অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের পুনরায় অপরাধে জড়ানোর ঝুঁকি কমাতে ওষুধের মাধ্যমে যৌন আকাঙ্ক্ষা ও যৌন তাড়না নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে চালু থাকা Medication to Manage Problematic Sexual Arousal (MMPSA) কর্মসূচি আগামী ধাপে আরও কারাগারে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে এটিকে সরাসরি ‘রাসায়নিকভাবে খোজাকরণ’ বলা হলেও সরকারি নথিতে এটি চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে দেওয়া একটি ওষুধভিত্তিক চিকিৎসা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের কারাগারগুলোতে কয়েক হাজার যৌন অপরাধী এ ধরনের চিকিৎসার জন্য বিবেচিত হতে পারেন। তবে এটি বর্তমানে স্বেচ্ছামূলক চিকিৎসা, আর সরকার ভবিষ্যতে কিছু ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক করা যায় কি না, সেটিও পর্যালোচনা করছে।

এই চিকিৎসায় মূলত দুই ধরনের ওষুধ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। অ্যান্টি-অ্যান্ড্রোজেন ওষুধ শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমিয়ে যৌন আকাঙ্ক্ষা বা লিবিডো কমাতে পারে। অন্যদিকে SSRI শ্রেণির কিছু ওষুধ অতিরিক্ত বা অনুপ্রবেশকারী যৌন চিন্তা ও তাড়না নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। 

তবে চিকিৎসাটি সবার জন্য উপযুক্ত নয়। যুক্তরাজ্য সরকারের নথিতেও বলা হয়েছে, ওষুধ চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে ক্লিনিক্যাল প্রয়োজন অনুযায়ী দেওয়া হবে এবং মানসিক চিকিৎসা, অপরাধ-আচরণ সংশোধন কর্মসূচি ও প্রবেশন তত্ত্বাবধানের সঙ্গে এটি ব্যবহার করা বেশি কার্যকর হতে পারে। 

যুক্তরাজ্য সরকার ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জানিয়েছিল, চারটি কারাগারে চলা পাইলট কর্মসূচি উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব ইংল্যান্ডে সম্প্রসারণ করে মোট ২০টি কারাগারে নেওয়া হবে। সরকারের দাবি, এর লক্ষ্য হলো যৌন অপরাধীদের পুনরায় অপরাধে জড়ানোর ঝুঁকি কমানো এবং জনসাধারণকে সুরক্ষিত রাখা। 

২০২৬ সালের জুলাইয়ের সরকারি তথ্যেও বলা হয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডের পরীক্ষামূলক কর্মসূচি উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব NHS অঞ্চলে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এটিকে ভবিষ্যতে জাতীয় পর্যায়ে চালুর একটি সম্ভাব্য প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। 

সাম্প্রতিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বর্তমানে কারাগারে থাকা যৌন অপরাধীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ—সংখ্যায় প্রায় ৩ হাজার ৭৫০ জন—ভবিষ্যতে এই চিকিৎসার জন্য বিবেচিত হতে পারেন। তবে যোগ্যতা নির্ধারণের বিষয়টি নির্ভর করবে ব্যক্তির চিকিৎসাগত প্রয়োজন, অপরাধের ধরন এবং ঝুঁকি মূল্যায়নের ওপর। 

অর্থাৎ কারাগারে থাকা সব ধর্ষক বা যৌন অপরাধীকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই ওষুধ দেওয়া হবে—এমন সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি।

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্য সরকার ধর্ষণ ও গুরুতর শিশু যৌন অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তি ও মুক্তির নিয়ম আরও কঠোর করার উদ্যোগও নিয়েছে। আগস্টের শুরুতে সরকার জানিয়েছে, ধর্ষণ, গুরুতর শিশু যৌন অপরাধ ও কিছু grooming অপরাধকে প্রস্তাবিত কিছু আগাম মুক্তির পরিবর্তনের বাইরে রাখা হবে। একই সঙ্গে ধর্ষকদের ওপর জিপিএস নজরদারি ও কঠোর কমিউনিটি তদারকির ব্যবস্থাও জোরদার করার কথা বলা হয়েছে।

এর পাশাপাশি যৌন তাড়না নিয়ন্ত্রণের ওষুধকে পুনর্বাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার একটি উপাদান হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই উদ্যোগের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো—ভবিষ্যতে চিকিৎসাটি বাধ্যতামূলক করা হবে কি না। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে সরকার জানিয়েছে, বর্তমানে MMPSA চিকিৎসকের মাধ্যমে ক্লিনিক্যাল প্রয়োজন অনুযায়ী দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কিছু ক্ষেত্রে এটি বাধ্যতামূলক করার সম্ভাবনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। 

মানবাধিকার ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের একাংশের উদ্বেগ হলো, কারাগারে থাকা কোনো ব্যক্তিকে মুক্তি বা প্যারোলের শর্ত হিসেবে এমন চিকিৎসা নিতে বাধ্য করা হলে সেটি প্রকৃত অর্থে ‘স্বেচ্ছামূলক’ থাকে কি না। এ ছাড়া ওষুধের দীর্ঘমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

টেস্টোস্টেরন কমানোর ওষুধের ক্ষেত্রে গুরুতর ও দীর্ঘমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে বলে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে দেওয়া সরকারি উত্তরে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই এ ধরনের ওষুধ চিকিৎসকের নিবিড় পর্যবেক্ষণের অধীনে ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু যৌন আকাঙ্ক্ষা কমিয়ে দিলেই একজন যৌন অপরাধীর অপরাধপ্রবণতার মূল কারণ দূর হয় না। অনেক অপরাধের পেছনে রাগ, ক্ষমতার অপব্যবহার, মানসিক সমস্যা, সম্পর্কগত জটিলতা বা মাদকাসক্তির মতো বিষয়ও ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে ওষুধের পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা ও আচরণগত পুনর্বাসন গুরুত্বপূর্ণ।

সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, স্বেচ্ছামূলক এই চিকিৎসা কর্মসূচি ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের কারাগারব্যবস্থায় আরও ব্যাপকভাবে চালুর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে জাতীয় পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের আগে কার্যকারিতা, নিরাপত্তা, চিকিৎসাগত ঝুঁকি এবং বন্দিদের সম্মতির বিষয়গুলো আরও মূল্যায়ন করা হবে।

সরকারের মূল যুক্তি হলো, যৌন অপরাধীদের ক্ষেত্রে যৌন তাড়না ও অতিরিক্ত যৌন চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে পুনরায় অপরাধের ঝুঁকি কমতে পারে। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন—এই চিকিৎসা কতটা কার্যকর, কার ক্ষেত্রে কার্যকর এবং বাধ্যতামূলক করলে এর নৈতিক ও আইনি সীমা কোথায়—তার স্পষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

যুক্তরাজ্যের এই উদ্যোগ বিশ্বজুড়ে ‘রাসায়নিক খোজাকরণ’ নিয়ে পুরোনো বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। সরকার এটিকে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার একমাত্র পদ্ধতি হিসেবে নয়, বরং পুনর্বাসন ও জননিরাপত্তার একটি চিকিৎসাভিত্তিক উপায় হিসেবে উপস্থাপন করছে। তবে চিকিৎসা, সম্মতি ও মানবাধিকারের প্রশ্নে বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

ChannelNRB Footer