নেপালের উত্তরাঞ্চলে ভয়াবহ পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছে। দেশটির তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুওয়া জেলায় ভোতে কোশি নদীতে আকস্মিক বন্যার পর বহু ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও অবকাঠামো ভেসে গেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে মৃতের সংখ্যা ৫৫ জনে পৌঁছানোর খবর পাওয়া গেলেও উদ্ধারকাজ চলার সঙ্গে সঙ্গে হতাহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সর্বশেষ প্রতিবেদনে মৃতের সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার কথা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।
এ ঘটনায় ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে শতাধিক ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের হিসাবে ৩৮৪ জন পর্যটক নিখোঁজ হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশি নাগরিক। ভারতীয়দের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নেদারল্যান্ডসের নাগরিকরাও নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তের হিমালয় অঞ্চলে প্রবল বন্যার পাশাপাশি ভূমিধস ও কাদামাটির স্রোত নেমে আসে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, একটি ভূমিকম্পের পর বরফ ও পাথরের বিশাল ধস লেন্দে খোলা নদীর প্রবাহ আটকে দেয়। পরে সেই বাধা ভেঙে বিপুল পরিমাণ পানি ও পাথর-কাদা নেমে এসে নদীর নিম্নাঞ্চলে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করে।
বন্যার পানির স্রোত এতটাই শক্তিশালী ছিল যে নদীর তীরবর্তী এলাকার ঘরবাড়ি, যানবাহন, সেতু ও বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাসুওয়া জেলার তিমুরে ও স্যাফ্রুবেশি এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
দুর্যোগের সময় ওই অঞ্চলে বিপুলসংখ্যক পর্যটক ছিলেন। তাদের অনেকেই তিব্বতের কৈলাস পর্বত ভ্রমণ বা তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে নেপাল হয়ে সীমান্ত এলাকায় যাচ্ছিলেন। ফলে নিখোঁজদের তালিকায় বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড জানিয়েছে, বিভিন্ন ট্যুর ও ট্রাভেল এজেন্সির কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিখোঁজ পর্যটকদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিত করতে সময় লাগছে।
বন্যা ও ভূমিধসে বহু সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্গত এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। খারাপ আবহাওয়া এবং যোগাযোগব্যবস্থার সমস্যার কারণে উদ্ধারকাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। হেলিকপ্টার দিয়ে উদ্ধার অভিযান চালানোর চেষ্টা করা হলেও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অনেক এলাকায় অবতরণ সম্ভব হচ্ছে না।
নেপাল সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছেন। চীনও সীমান্তের তিব্বত অংশে উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করেছে। ভারতসহ কয়েকটি দেশ নিজেদের নাগরিকদের সন্ধান ও উদ্ধারকাজে নেপালকে সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছে।
পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নদীর উজানে এখনও পানি ও ধসের কারণে বাধা তৈরি থাকায় নতুন করে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। এ কারণে নেপালের পাশাপাশি ভারতের বিহার ও উত্তর প্রদেশেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। নিচু এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উদ্ধারকাজ যত এগোচ্ছে, ততই হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। দিনের বিভিন্ন সময়ে মৃতের সংখ্যা ৯, ১৭, ২২ এবং ৫৫ হিসেবে জানানো হলেও পরবর্তী সময়ে নেপালি পুলিশের হিসাবে তা আরও বেড়েছে। দুর্গম ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারী দল এখনও পুরোপুরি পৌঁছাতে পারেনি। ফলে চূড়ান্ত হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে নেপালজুড়ে জরুরি উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাসও নেপালি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
সূত্র: দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া
আরও পড়ুন:







