নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৪০০-তে পৌঁছেছে। নেপাল পুলিশের রাত ৯টার সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশটির আটটি জেলায় ৩৮৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে শত শত মানুষ এখনো নিখোঁজ বা যোগাযোগবিচ্ছিন্ন রয়েছেন। দুর্গম এলাকায় উদ্ধার অভিযান চলমান থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বুধবার সকালে নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী রাসুয়া জেলার ভোতে কোশি নদীতে হঠাৎ ভয়াবহ পানির ঢল নামে। পরে সেই স্রোত ত্রিশুলি ও নারায়ণী নদী অববাহিকা দিয়ে নিচের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে বহু বসতি, সড়ক, সেতু, যানবাহন ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পানির তোড়ে ভেসে যায়।
নেপাল পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, চিতওয়ানে সর্বোচ্চ ১৩৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া পূর্ব নওয়ালপরাসিতে ৮৭, ধাদিংয়ে ৩৩, গোরখায় ৩২, নুওয়াকোটে ২৮, তানাহুনে ২৮, পশ্চিম নওয়ালপরাসিতে ২৭ এবং রাসুয়ায় ১৭টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। বন্যায় ৪৬৬ জন আহতকে উদ্ধার করা হয়েছে।
নেপাল সেনাবাহিনী, নেপাল পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা হেলিকপ্টার ও স্থলপথে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছেন। তবে বন্যায় রাস্তা ও সেতু ধ্বংস হওয়ায় অনেক দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পকে সম্ভাব্য কারণ মনে করা হলেও পরবর্তী অনুসন্ধানে হিমবাহ ধসের বিষয়টি সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পাহাড়ের ওপর থেকে বরফ, পাথর ও মাটির বিশাল অংশ ধসে নদীর পথে নেমে এসে ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক ঢল তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহের অস্থিতিশীলতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ ধরনের আকস্মিক বন্যা ও হিমবাহ-সম্পর্কিত দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
এই দুর্যোগে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক পর্যটক ও বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ হয়েছেন। নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ৫৭৯ পর্যটকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না—তাদের মধ্যে ৪৬৬ জন বিদেশি এবং ১১৩ জন নেপালি।
অনেক পর্যটক ও তীর্থযাত্রী তিব্বতের কৈলাস-মানস সরোবরের পথে ছিলেন। ফলে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বন্যার পানির স্রোতে নেপালের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ৩৫টি মোটরযান চলাচলযোগ্য সেতু, ৪৫টি ঝুলন্ত সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতির মুখে পড়েছে।
ফলে দুর্গত অনেক এলাকার সঙ্গে রাজধানী কাঠমান্ডুসহ অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। উদ্ধার ও ত্রাণ পৌঁছাতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
দুর্যোগের পর পাহাড়ি এলাকায় নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে একটি নতুন জলাধারসদৃশ জলাশয় তৈরি হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। সেটি ভেঙে গেলে আবারও আকস্মিক পানির ঢল নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
নেপাল সেনাবাহিনী দুর্গম এলাকায় হেলিকপ্টার ব্যবহার করে আটকে পড়া মানুষদের সরিয়ে নিচ্ছে। এখন পর্যন্ত শতাধিক মানুষকে বিমানপথে উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থলপথে নিখোঁজদের সন্ধান, মরদেহ উদ্ধার এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক পরিষ্কারের কাজ চলছে।
বন্যায় উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে যাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি, তাদের শনাক্ত করতে নেপাল পুলিশ বিশেষ তালিকাও প্রকাশ করেছে। স্বজনদের সহায়তার জন্য মরদেহের ছবি ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
বন্যায় ঘরবাড়ি হারিয়ে বহু মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছেন। যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্গত এলাকায় খাদ্য, পানি, ওষুধ ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা পৌঁছানোও কঠিন হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং জরুরি মানবিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
নেপাল সরকার উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য জাতীয় দুর্যোগ তহবিলে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ত্রাণ তহবিলে অর্থ সহায়তা দেওয়া শুরু করেছে।
বুধবারের আকস্মিক বন্যা নেপালের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করেছে। মৃতের সংখ্যা ইতোমধ্যে ৩৮৯-এ পৌঁছেছে এবং বহু মানুষ এখনো নিখোঁজ। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধার অভিযান পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
কর্তৃপক্ষের প্রধান লক্ষ্য এখন নিখোঁজদের জীবিত অবস্থায় উদ্ধার, আহতদের চিকিৎসা এবং দুর্গত মানুষের কাছে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া। একই সঙ্গে নতুন করে বন্যা বা ভূমিধসের ঝুঁকি থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সূত্র: বিবিসি
আরও পড়ুন:







