নেপালের পাহাড়ি জনপদে এখন শুধুই ধ্বংসস্তূপ, কাদা আর স্বজনহারাদের আহাজারি। ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের কয়েক দিন পরও ধ্বংসস্তূপ সরাতে গিয়ে একের পর এক মরদেহ উদ্ধার করছেন উদ্ধারকর্মীরা। সময় যত গড়াচ্ছে, ততই বাড়ছে মৃতের সংখ্যা; একই সঙ্গে দীর্ঘ হচ্ছে নিখোঁজ মানুষের তালিকাও।
সর্বশেষ পাওয়া তথ্যে নেপালে মৃতের সংখ্যা ৪৭৫ জনে পৌঁছেছে। আরও প্রায় ১ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। চীনের তিব্বত অংশেও প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। ফলে নেপাল-তিব্বত সীমান্তজুড়ে এই দুর্যোগ ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের রূপ নিয়েছে।
গত ২৬ আগস্ট নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে। বন্যার সঙ্গে নেমে আসে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর, বরফ ও ধ্বংসাবশেষ। কয়েকটি এলাকায় নদীর পানি অস্বাভাবিক দ্রুত বেড়ে গিয়ে বসতি, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন স্থাপনা ভাসিয়ে নেয়।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে নেপালের রাসুয়া ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকা। প্রবল স্রোত বহু মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় এবং অনেক ঘরবাড়ি কাদার নিচে চাপা পড়ে।
দুর্যোগের কয়েক দিন পরও উদ্ধারকারীদের প্রধান কাজ এখন ধ্বংসস্তূপ ও কাদা সরিয়ে মরদেহ এবং জীবিতদের সন্ধান করা। অনেক এলাকায় রাস্তা ও সেতু ধ্বংস হওয়ায় ভারী উদ্ধারযন্ত্র পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং নতুন করে বন্যা বা ভূমিধসের আশঙ্কা উদ্ধার অভিযানকে আরও কঠিন করে তুলছে।
স্থানীয়দের অনেকেই জানিয়েছেন, বন্যার স্রোত এত দ্রুত ও শক্তিশালী ছিল যে বহু মানুষ ঘর থেকে বের হওয়ার সুযোগও পাননি। কিছু এলাকায় পুরো বসতি কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়েছে।
এই দুর্যোগের একটি বড় উদ্বেগের জায়গা হলো নিখোঁজদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। সীমান্তবর্তী অঞ্চলটি তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হওয়ায় ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক সেখানে ছিলেন।
নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে নিখোঁজের সংখ্যা ১,৫০০-এর বেশি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দুই দেশের তালিকায় কিছু হিসাবের পার্থক্য থাকায় প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে সময় লাগছে।
উদ্ধারকাজ চলার মধ্যেই নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ভূমিধসের ফলে নদীর পানি আটকে একটি অস্থায়ী হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রবার ওই হ্রদের পানি উপচে পড়ায় নতুন বন্যার আশঙ্কা দেখা দেয়। পরিস্থিতির কারণে সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।
নদীর নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উদ্ধারকারীরাও ঝুঁকি বিবেচনা করে অভিযান পরিচালনা করছেন।
প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উচ্চ হিমালয় অঞ্চলে একটি হিমবাহ ধস বা বরফ-পাথরের বিশাল স্তর ভেঙে পড়ার ঘটনা থেকে বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ নদীপথে নেমে আসতে পারে। এর সঙ্গে ভূমিধস ও নদীর প্রবাহে সাময়িক বাধা যুক্ত হয়ে হঠাৎ করে ভয়াবহ জলস্রোত তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘটনাটির সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে তদন্ত এখনও চলছে। তবে হিমালয়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও হিমবাহের পরিবর্তন ভবিষ্যতে এ ধরনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে কি না, তা নিয়েও বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে আসছেন।
নেপালের সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং অন্যান্য উদ্ধারকারী সংস্থা দুর্গত এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে। হেলিকপ্টার, ভারী যন্ত্রপাতি, ড্রোন এবং প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল ব্যবহার করে দুর্গম এলাকায় আটকে পড়াদের খোঁজা হচ্ছে।
তবে ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়ক ও সেতু, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং পাহাড়ি ভূখণ্ডের কারণে অনেক এলাকায় পৌঁছানো এখনও কঠিন। ফলে নিখোঁজদের পরিবারের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
হাসপাতাল ও উদ্ধারকেন্দ্রগুলোর সামনে স্বজনদের ভিড়। কেউ হাতে ছবি নিয়ে প্রিয়জনের খোঁজ করছেন, কেউ অপেক্ষা করছেন একটি ফোনকলের জন্য। পরিচয় নিশ্চিত করতে উদ্ধার হওয়া মরদেহ শনাক্ত করার কাজও চলছে।
প্রতিটি উদ্ধার অভিযানের পর নতুন কোনো মরদেহ পাওয়ার খবর যেমন শোক বাড়াচ্ছে, তেমনি ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত কাউকে উদ্ধারের আশাও ধরে রেখেছেন স্বজনেরা।
নেপালের এই বিপর্যয় এখন শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়—এটি পরিণত হয়েছে এক গভীর মানবিক সংকটে। কাদা ও ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও কত মানুষের নিথর দেহ পড়ে আছে, আর কতজন নিখোঁজ মানুষের ভাগ্যে কী ঘটেছে—সেই উত্তর খুঁজতেই পাহাড়ি উপত্যকাগুলোতে চলছে নিরলস উদ্ধার অভিযান।
সূত্র: রয়টার্স
আরও পড়ুন:







