News Ticker
221.png

নরওয়ের রাজা হারাল্ড পঞ্চম আর নেই

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ আগস্ট, ২০২৬ ১৬:২৭

আপডেট: ২৮ আগস্ট, ২০২৬ ১৬:৪৬

শেয়ার

শেয়ার

নরওয়ের রাজা হারাল্ড পঞ্চম আর নেই
ছবি: সংগৃহীত

নরওয়ের রাজা হারাল্ড পঞ্চম আর নেই। ৮৯ বছর বয়সে মারা গেছেন ইউরোপের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ শাসক। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) স্থানীয় সময় সকাল ৬টা ৩৫ মিনিটে অসলো বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে শান্তিপূর্ণভাবে তার মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে নরওয়ের রাজপ্রাসাদ।

তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নরওয়ের সিংহাসনে দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন দশকের এক অধ্যায়ের অবসান হলো। ১৯৯১ সালে বাবা রাজা ওলাভ পঞ্চমের মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেছিলেন হারাল্ড। দীর্ঘ ৩৫ বছরের রাজত্বে তিনি নরওয়ের রাজতন্ত্রকে আরও আধুনিক, উদার ও সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

রাজা হারাল্ড গত ১৭ আগস্ট থেকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়ায় ভুগছিলেন—এটি এমন একটি রক্তজনিত সমস্যা, যাতে শরীর নতুন রক্তকণিকা তৈরির চেয়ে দ্রুত পুরোনো লোহিত রক্তকণিকা ধ্বংস করে। পরবর্তী সময়ে তার রক্তে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণও দেখা দেয় এবং অবস্থার অবনতি ঘটে।

মৃত্যুর আগের দিন রাজপ্রাসাদ জানিয়েছিল, রাজার অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর। এরপর পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে তার পাশে জড়ো হন। শেষ সময়ে স্ত্রী রানি সোঞ্জা, ছেলে ক্রাউন প্রিন্স হাকনসহ পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যরা তার পাশে ছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

১৯৩৭ সালে জন্ম নেওয়া হারাল্ড ছিলেন রাজা ওলাভ পঞ্চমের ছেলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানির নরওয়ে দখলের পর রাজপরিবার যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেয়; ছোটবেলার একটি সময় সেখানেই কাটান হারাল্ড। যুদ্ধ শেষে পরিবার নরওয়েতে ফিরে আসে।

১৯৯১ সালের ১৭ জানুয়ারি বাবা ওলাভ পঞ্চমের মৃত্যুর পর হারাল্ড নরওয়ের রাজা হন। তার রাজত্বের সময় নরওয়ের অর্থনীতি, বিশেষ করে তেল ও গ্যাস খাত, উল্লেখযোগ্যভাবে সমৃদ্ধ হয়। একই সময়ে রাজা নিজেকে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

হারাল্ডকে নরওয়ের রাজতন্ত্রের আধুনিকায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়। তিনি রাজপরিবারকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও সহজলভ্য ও অনাড়ম্বর করে তুলেছিলেন।

১৯৬৮ সালে তিনি তার স্কুলজীবনের প্রেমিকা সোঞ্জা হারাল্ডসেনকে বিয়ে করেন। সোঞ্জা ছিলেন সাধারণ পরিবারের মেয়ে। একজন সাধারণ নাগরিককে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত সে সময়ের ইউরোপীয় রাজপরিবারের প্রচলিত রীতির তুলনায় ব্যতিক্রমী ছিল। পরে সোঞ্জা নরওয়ের রানি হন। তাদের দুই সন্তান—ক্রাউন প্রিন্স হাকন এবং প্রিন্সেস মার্থা লুইস।

হারাল্ডের রাজত্বের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়গুলোর একটি ছিল ২০১১ সালের সন্ত্রাসী হামলার পর তার ভূমিকা। ওই হামলায় নরওয়েতে ৭৭ জন নিহত হন। ভয়াবহ সেই ঘটনার পর রাজা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান এবং তার আবেগঘন বক্তব্য ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়।

সহনশীলতা, বৈচিত্র্য ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি তার সমর্থনও তাকে নরওয়ের মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে। তিনি রাজাকে শুধু আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নয়, বরং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। 

রাজা হারাল্ড নিজেও ছিলেন একজন দক্ষ ক্রীড়াবিদ। বিশেষ করে নৌকাবাইচ বা সেলিংয়ের প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। অলিম্পিকেও তিনি সেলিংয়ে অংশ নিয়েছিলেন। পরিবেশ ও প্রকৃতির প্রতিও তার আগ্রহ ছিল এবং রাজত্বের বাইরেও এসব বিষয়ে সক্রিয় ছিলেন।

হারাল্ডের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই তার ছেলে ক্রাউন প্রিন্স হাকন নরওয়ের নতুন রাজা হয়েছেন। হাকনের বয়স ৫৩ বছর। বাবার অসুস্থতার সময় তিনি একাধিকবার রিজেন্ট হিসেবে রাজার দায়িত্ব পালন করেছেন।

নরওয়ের সাংবিধানিক ব্যবস্থায় নতুন রাজার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য ব্রিটিশ ধাঁচের কোনো রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠান হয় না। হাকন সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করবেন এবং পার্লামেন্টে সংবিধান ও আইন মেনে চলার শপথ নেবেন। 

রাজার মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর নরওয়ের রাজপ্রাসাদের পতাকা অর্ধনমিত করা হয়। অসলোতে সাধারণ মানুষ রাজপ্রাসাদের বাইরে ফুল দিয়ে প্রয়াত রাজার প্রতি শ্রদ্ধা জানান। দেশটির সামরিক বাহিনীও শোক প্রকাশ করেছে।

নরওয়ের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, রাজার সম্মানে দেশের নয়টি স্থানে ২১ রাউন্ডের শোক-তোপধ্বনি অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বিভিন্ন সামরিক ইউনিটে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হবে। 

হারাল্ডের মৃত্যুতে ইউরোপের বিভিন্ন রাজপরিবার ও আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে শোকবার্তা আসতে শুরু করেছে। ব্রিটেনের রাজা চার্লস তৃতীয়সহ বিভিন্ন দেশের রাজপরিবারের সদস্যরা নরওয়ের প্রয়াত রাজার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

৩৫ বছরের রাজত্বে হারাল্ড নরওয়ের রাজতন্ত্রকে যে অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন, তার উত্তরাধিকার এখন বহন করতে হবে নতুন রাজা হাকনকে। তবে হারাল্ডের মৃত্যুর সময় নরওয়ের রাজপরিবার এমন এক পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন পরিবারটির কয়েকটি বিষয় নিয়ে জনমনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন রাজার সামনে ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি রাজপরিবারের প্রতি মানুষের আস্থা অটুট রাখার বড় চ্যালেঞ্জও থাকছে।

সূত্র: রয়টার্স

ChannelNRB Footer