News Ticker
221.png

লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে সাগরে ৩৭ সুদানি অভিবাসীর মৃত্যু

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ আগস্ট, ২০২৬ ১৬:৫০

শেয়ার

শেয়ার

লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে সাগরে ৩৭ সুদানি অভিবাসীর মৃত্যু
ছবি: সংগৃহীত

যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদান থেকে নিরাপদ জীবনের আশায় ইউরোপে পাড়ি দিতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারালেন অন্তত ৩৭ সুদানি অভিবাসী। লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করা একটি নৌযানে সমুদ্রপথে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে সুদানের একটি ত্রাণ ও নাগরিক সহায়তা কমিটি।

নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। সুদানের যুদ্ধ ও সহিংসতা থেকে পালিয়ে নিরাপত্তার আশায় তারা ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই যাত্রাই শেষ পর্যন্ত তাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 

ঘটনার পর নিহত ৩৭ জনের নামের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে El-Fasher Resistance Coordination। তালিকায় একাধিক শিশুর নাম রয়েছে। তাদের মধ্যে মাত্র সাত মাস বয়সী একটি শিশুও ছিল। এছাড়া ৩, ৬, ৮, ৯, ১২, ১৩ ও ১৬ বছর বয়সী শিশুর মৃত্যুর তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।

নিহতদের অনেকে সুদানের বিভিন্ন যুদ্ধকবলিত এলাকা থেকে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে উত্তর দারফুরের রাজধানী এল ফাশের, এল জেনেইনা, নিয়ালা, গেদারেফ, ইস্ট নাইল ও বাবানুসার বাসিন্দারাও ছিলেন।

নিহতদের বিষয়ে শোক জানিয়ে ত্রাণ কমিটিটি বলেছে, এসব নারী ও শিশু নিরাপত্তার সন্ধানে ঘর ছেড়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমুদ্রেই মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন।

সংগঠনটির ভাষ্য, সুদানের মানুষের জন্য বিপদ যেন আর কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ নেই। নিজ শহর, বাস্তুচ্যুত মানুষের পথ কিংবা ইউরোপে যাওয়ার অভিবাসনপথ—সবখানেই তাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

সুদানে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে দেশটির সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (RSF)-এর মধ্যে ভয়াবহ সংঘাত চলছে। ক্ষমতা ও সামরিক কাঠামো নিয়ে বিরোধ থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাবে, সংঘাতের কারণে লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সুদান বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় মানবিক সংকটের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে দারফুর অঞ্চলে সংঘাত ও মানবিক পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। এল ফাশেরসহ বিভিন্ন এলাকায় বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে।

যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও নিরাপত্তাহীনতা থেকে পালিয়ে বহু সুদানি নাগরিক প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নেওয়ার পাশাপাশি ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। তাদের একটি অংশ লিবিয়াকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করছে।

পূর্ব লিবিয়ার তোব্রুক এলাকা থেকে ছোট নৌযানে করে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের দিকে যাওয়ার প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। গ্রিসের কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর হাজার হাজার অভিবাসী লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে গ্রিসে পৌঁছেছেন। 

তবে এই পথ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই নৌযান, পর্যাপ্ত জ্বালানি ও খাবারের অভাব, দুর্বল নৌযান এবং দক্ষ নাবিকের অনুপস্থিতির কারণে মাঝসমুদ্রে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর ঘটনা প্রায়ই ঘটে।

ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখিয়ে অভিবাসীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায় করে মানবপাচারকারী চক্রগুলো। অনেক ক্ষেত্রে অভিবাসীদের এমন নৌযানে তুলে দেওয়া হয়, যা দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়।

সম্প্রতি লিবিয়া থেকে গ্রিসগামী বিভিন্ন নৌযান থেকে বিপুলসংখ্যক অভিবাসীকে উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। গ্রিসের কোস্টগার্ড জানিয়েছে, ত্রিপোলি নয়, বরং পূর্ব লিবিয়ার তোব্রুক অঞ্চল এখন গ্রিসগামী অনিয়মিত অভিবাসনের অন্যতম প্রধান যাত্রাস্থলে পরিণত হয়েছে। 

ভূমধ্যসাগরের এই রুটে সাম্প্রতিক সময়েও একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। চলতি আগস্টেই লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করা আরেকটি নৌযানে দীর্ঘ সময় সাগরে ভেসে থাকার পর অন্তত ৯ বাংলাদেশি ও একজন সুদানি নাগরিকের মৃত্যু হয়। ওই নৌযানে থাকা ৪২ জন প্রায় ১০-১১ দিন সাগরে খাবার ও পানির সংকটে আটকা পড়েছিলেন। পরে ২৯ জনকে মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূল থেকে উদ্ধার করা হয়।

এর মাত্র কয়েক দিন পর আবারও ৩৭ সুদানি অভিবাসীর মৃত্যুর খবর সামনে এল। ফলে লিবিয়া-গ্রিস সমুদ্রপথে মানবপাচার ও অনিয়মিত অভিবাসনের ভয়াবহ ঝুঁকি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

৩৭ জনের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করা হলেও সমুদ্রযাত্রায় থাকা অন্যদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনও পরিষ্কার নয়। কতজন জীবিত উদ্ধার হয়েছেন, কতজন নিখোঁজ রয়েছেন এবং দুর্ঘটনাটি ঠিক কোথায় ঘটেছে—এসব বিষয়ে আরও তথ্যের অপেক্ষা রয়েছে।

নিহতদের পরিচয় ও পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়াও পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ওপর নির্ভর করবে।

সুদানের যুদ্ধ মানুষকে ঘর ছাড়তে বাধ্য করছে। কেউ সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিচ্ছেন, আবার কেউ পাচারকারীদের হাতে অর্থ তুলে দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছেন।

সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি

ChannelNRB Footer