নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৪৭ জনে দাঁড়িয়েছে। বুধবার হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধসে নদীতে বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, কাদা ও পাথর নেমে আসার পর এই ভয়াবহ দুর্যোগের সৃষ্টি হয়। নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় এতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে।
নেপাল পুলিশের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশটির বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধারকারীরা শত শত মরদেহ উদ্ধার করেছেন। একই সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। ধ্বংসস্তূপ, কাদামাটি ও বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থার কারণে নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, হিমালয়ের একটি হিমবাহের বড় অংশ ধসে পড়ার পর এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত। বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নদীর পানির সঙ্গে মিশে ভয়াবহ গতিতে নিচের দিকে নেমে আসে। এতে নদীর তীরবর্তী বসতি, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন অবকাঠামো মুহূর্তের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নেপালের রসুয়া, নুয়াকোটসহ কয়েকটি এলাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পানির সঙ্গে বয়ে আসা কাদা ও পাথরের নিচে বহু ঘরবাড়ি ও যানবাহন চাপা পড়েছে।
মৃতের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় এক হাজার বা তারও বেশি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের পর্যটক ও তীর্থযাত্রীও রয়েছেন।
বিশেষ করে ভারতের বহু নাগরিকের এখনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, ইউক্রেন, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ আরও কয়েকটি দেশের নাগরিকও নিখোঁজ তালিকায় রয়েছেন।
বন্যার পর নেপালি সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য উদ্ধারকারী সংস্থা ব্যাপক অভিযান শুরু করেছে। হেলিকপ্টারের পাশাপাশি ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিত ও নিখোঁজদের সন্ধান করা হচ্ছে।
এ পর্যন্ত ৩ হাজারের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও সেতু এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধারকাজে বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়েছে।
প্রথম দফার বন্যার ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সীমান্তের ওপারে জমে থাকা পানির একটি হ্রদ উপচে পড়ার আশঙ্কায় নেপাল ও চীনের উদ্ধারকারী দলকে সতর্ক করা হয়েছিল। এ কারণে একপর্যায়ে উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধও রাখতে হয়। পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার পর আবার অভিযান শুরু হয়েছে।
নেপালের কর্তৃপক্ষ নদী তীরবর্তী ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
নেপালের পাশাপাশি চীনের তিব্বত অঞ্চলেও এই দুর্যোগের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। সেখানে অন্তত ৫ জনের মৃত্যু এবং বহু মানুষের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ফলে নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে দুর্যোগে প্রাণহানি আরও বেড়েছে।
বন্যার পানিতে বহু ঘরবাড়ি, সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থাও ব্যাহত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত বাণিজ্যপথের কিছু অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় নেপাল সরকার জরুরি ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকেও সহায়তার প্রস্তাব এসেছে।
বিশেষজ্ঞ ও কর্তৃপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন নতুন করে পাহাড়ি ঢল বা হ্রদভাঙা বন্যার আশঙ্কা। হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ও বরফের পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের আকস্মিক দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন বিজ্ঞানীরা।
নেপালের সাম্প্রতিক এই বিপর্যয় আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, পাহাড়ি অঞ্চলে হিমবাহ ধস ও আকস্মিক বন্যা কতটা ভয়াবহ হতে পারে। উদ্ধার অভিযান চলতে থাকায় মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স
আরও পড়ুন:







