নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস ও হিমবাহ ধসের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৫৮৪ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও প্রতিকূল আবহাওয়া, ধ্বংসপ্রাপ্ত সড়ক-সেতু এবং নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হিসাবে, নেপালেই ৫৭৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। চীনের তিব্বত অঞ্চলে আরও কয়েকজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দুই দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা ২ হাজার ৪০০ ছাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে উদ্ধার অভিযান চলমান থাকায় হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে।
২৬ আগস্ট হিমালয়ের নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় একটি হিমবাহ বা বরফ-শিলার বিশাল অংশ ধসে নদীতে পড়ে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে নদীতে আকস্মিকভাবে বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, পাথর ও কাদামাটি নেমে আসে। প্রবল স্রোত মুহূর্তের মধ্যে নদীসংলগ্ন জনপদ, সড়ক, সেতু, ভবন ও বিভিন্ন অবকাঠামো ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
বিশেষ করে নেপালের রাসুয়া জেলা এবং চীনের তিব্বত অঞ্চলের গিরং (Gyirong) সীমান্ত এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত যোগাযোগব্যবস্থা ও বাণিজ্যপথও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নিখোঁজদের তালিকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক, পর্যটক, তীর্থযাত্রী এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী রয়েছেন। নেপালের পার্বত্য সীমান্ত দিয়ে কৈলাস-মানস সরোবরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও পর্যটন গন্তব্যে যাতায়াতের সময় অনেক মানুষ দুর্যোগের কবলে পড়েন।
নেপাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাজার হাজার মানুষকে ইতোমধ্যে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া বা উদ্ধার করা হয়েছে। তবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় অনেক নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
দুর্যোগের পর নেপাল সরকার সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের উদ্ধারকাজে নিয়োজিত করেছে। হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দুর্গম এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ধ্বংসস্তূপ, কাদা ও পলিতে আটকে থাকা ব্যক্তিদের উদ্ধারে বিশেষ দল কাজ করছে।
রাসুয়া জেলার একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে শতাধিক মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেখানে এক থেকে দেড় মিটারের মতো কাদা জমে যাওয়ায় উদ্ধারকারীদের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। রশি, ঝুড়ি ও ড্রোন ব্যবহার করেও উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে।
দুর্যোগের পর পাহাড়ি এলাকায় পানি ও ধ্বংসাবশেষ জমে নতুন জলাধার বা হ্রদ তৈরি হওয়ায় আরও বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় এসব জলাধারের পানি উপচে পড়লে দ্বিতীয় দফায় আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন কর্মকর্তারা। এ কারণে উদ্ধারকারী দলগুলোকে অতিরিক্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে।
চীনা কর্তৃপক্ষও তিব্বতের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে পানি ও হিমবাহ-সংক্রান্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। সম্ভাব্য নতুন বিপর্যয় ঠেকাতে স্যাটেলাইটসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি চালানো হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক রেডক্রসসহ বিভিন্ন মানবিক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, এই দুর্যোগে ৯৩ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং তাদের জরুরি খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের প্রয়োজন রয়েছে। বন্যায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল, সড়ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও হিমবাহের অস্থিতিশীলতা এ ধরনের আকস্মিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে হিমবাহ ও হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদগুলো পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কতা এবং সীমান্তবর্তী দেশগুলোর মধ্যে দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বয় আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম এখনো চলছে। নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান আরও কয়েক দিন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে খাবার, পানি ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
তবে আবহাওয়ার অবনতি, ভূমিধস এবং নতুন করে বন্যার আশঙ্কা উদ্ধারকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সতর্কতা জারি থাকবে এবং নিখোঁজদের সন্ধান অব্যাহত থাকবে।
সূত্র: রয়টার্স
আরও পড়ুন:







