News Ticker
221.png

বন্যার সতর্কবার্তা পেয়ে ১৬৪৩ জন শিশুর প্রাণ বাঁচালেন নেপালের শিক্ষক

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট, ২০২৬ ২১:৫৬

শেয়ার

শেয়ার

বন্যার সতর্কবার্তা পেয়ে ১৬৪৩ জন শিশুর প্রাণ বাঁচালেন নেপালের শিক্ষক
ছবি: সংগৃহীত

ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পানি মুহূর্তের মধ্যে স্কুলের দিকে ধেয়ে আসছে—এমন সতর্কবার্তা পেয়েই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন নেপালের এক স্কুলপ্রধান। ঘণ্টা বাজিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের স্কুল থেকে বের করে উঁচু স্থানে সরিয়ে নেন তিনি। তাঁর সেই কয়েক মিনিটের সিদ্ধান্তে প্রাণে বেঁচে যায় ১ হাজার ৬৪৩ শিশু।

নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী উপত্যকার ত্রিভুবন ত্রিশূলী সেকেন্ডারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও ইংরেজির শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদির এই সাহসী ভূমিকা এখন দেশটির ভয়াবহ বন্যার মধ্যে মানবিকতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছে। 

ঘটনাটি ঘটে বুধবার, ২৬ আগস্ট সকালে। স্থানীয় সময় সকাল আনুমানিক ৯টা ২০ মিনিটে রাজেন্দ্র দাওয়াদির কাছে এক বন্ধু ফোন করেন। তিনি জানান, কাছের একটি গ্রাম নদীর পানিতে ভেসে গেছে এবং ভয়াবহ স্রোত দ্রুত স্কুলের এলাকার দিকে এগিয়ে আসছে। দাওয়াদিকে দ্রুত সরে যাওয়ার পরামর্শ দেন ওই ব্যক্তি।

প্রথমে রাজেন্দ্র মনে করেছিলেন, স্কুলটি তুলনামূলক নিরাপদ। তিনতলা কংক্রিটের ভবনটি নদীর তলদেশের চেয়ে প্রায় ৬০ মিটার উঁচুতে ছিল। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক স্কুলে এসে জানান, পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে।

এরপর আর কোনো ঝুঁকি নেননি রাজেন্দ্র।

রাজেন্দ্র সঙ্গে সঙ্গে স্কুলের ঘণ্টা বাজিয়ে দেন। তবে সেটি ছিল ক্লাস শুরুর ঘণ্টা নয়—ছিল বিপদের সংকেত।

তিনি শিক্ষকদের নির্দেশ দেন, শ্রেণিকক্ষে থাকা সব শিক্ষার্থীকে দ্রুত বাইরে নিয়ে যেতে। একই সঙ্গে স্কুলবাসের চালকদের ফোন করে বাস ঘুরিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বলেন। প্রায় সব চালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হলেও একটি বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। ওই বাস তখন একটি সেতু পার হচ্ছিল।

শিক্ষার্থীরা দ্রুত স্কুল ছেড়ে উঁচু এলাকার দিকে ছুটতে শুরু করে। এক শিক্ষার্থী আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে মোটরসাইকেলে করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। অন্যরা পায়ে হেঁটে পাহাড়ি উঁচু এলাকার দিকে সরে যায়। রাজেন্দ্র নিজেও শিক্ষার্থীদের পেছনে থেকে তাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

শিক্ষার্থীরা নিরাপদ উচ্চতায় পৌঁছানোর পরই ভয়াবহ বন্যার স্রোত আঘাত হানে এলাকায়। পানির সঙ্গে নেমে আসে কাদা, পাথর ও বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ।

যে স্কুল ভবনে কিছুক্ষণ আগেও ১ হাজার ৬৪৩ শিশু অবস্থান করছিল, সেটিই পরে ভয়াবহ বন্যার ধাক্কায় ধ্বংস হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা একটি বোধি গাছের নিচে আশ্রয় নেয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজেন্দ্রের দ্রুত সিদ্ধান্তের কারণে স্কুলের প্রায় সব শিক্ষার্থী ও অধিকাংশ শিক্ষক-কর্মচারী প্রাণে বেঁচে যান।

এই উদ্ধার অভিযানের মধ্যেও স্কুলের দুজন কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।

সামাজিক ইতিহাসের শিক্ষক সান্তোষ পারিয়ার, বয়স ৩২, বন্যার সময় নিজের ভাড়া বাসায় ফিরে গিয়েছিলেন। তিনি সেখানে রান্না করার জন্য গিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। পরে ভয়াবহ স্রোতে তিনি ভেসে যান।

স্কুলের পরিচ্ছন্নতাকর্মী সুলতান লামাও বিপদের মধ্যে ফিরে গিয়ে স্কুলের দরজা বন্ধ করার চেষ্টা করার সময় প্রাণ হারান। 

শিক্ষার্থীদের জীবন বাঁচানোর পর স্থানীয়দের কাছে নায়ক হয়ে উঠেছেন রাজেন্দ্র দাওয়াদি। কিন্তু নিজের ভূমিকা নিয়ে তাঁর বক্তব্য অত্যন্ত সাধারণ।

বিপদের মুহূর্তে তিনি যা করেছেন, সেটিকে নিজের দায়িত্ব হিসেবেই দেখছেন তিনি। ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্কুলের জায়গায় দাঁড়িয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিল—‘আমি আর কী করতে পারতাম?

তবে তাঁর সেই দ্রুত সিদ্ধান্তই যে ১ হাজার ৬৪৩ শিশুর জীবন রক্ষা করেছে, তা এখন নেপালের ভয়াবহ বন্যার অন্যতম আলোচিত ঘটনা।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও আকস্মিক জলপ্রবাহের পেছনে হিমবাহ ও পাহাড়ের বরফ-পাথরের বিশাল অংশ ভেঙে পড়ার ঘটনা ভূমিকা রেখেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

লাংটাং লিরুং পর্বত থেকে বরফ ও পাথরের একটি বিশাল অংশ ভেঙে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে নদীর সরু গিরিখাতে পড়ে যায় বলে বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। এর ফলে নদীতে আকস্মিকভাবে বিপুল পরিমাণ পানি, বরফ, পাথর ও মাটি নেমে ভয়াবহ স্রোত তৈরি হয়।

এই দুর্যোগে নেপালের ত্রিশূলী উপত্যকা ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু ঘরবাড়ি, সেতু, সড়ক ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।

বন্যার পর ত্রিভুবন ত্রিশূলী সেকেন্ডারি স্কুলের ভবনটি ধ্বংস হয়ে গেলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—স্কুলে থাকা ১ হাজার ৬৪৩ শিশুকে সময়মতো সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল।

নেপালের এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে যেখানে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন ও নিখোঁজ হয়েছেন, সেখানে একজন শিক্ষকের কয়েক মিনিটের উপস্থিত বুদ্ধি ও নেতৃত্ব এতগুলো শিশুর জীবন রক্ষা করেছে।

রাজেন্দ্র দাওয়াদির গল্প তাই শুধু একটি উদ্ধার অভিযানের গল্প নয়; এটি দুর্যোগের মুহূর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত, নেতৃত্ব এবং সতর্কবার্তার গুরুত্বেরও এক অসাধারণ উদাহরণ।

সূত্র: এনডিটিভি

ChannelNRB Footer