ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে চীন। দেশটির বন্যা ও ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ৫০ টন জরুরি ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে বেইজিং। রোববার (৩০ আগস্ট) চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) বিমানবাহিনীর দুটি বড় ওয়াই-২০ পরিবহন বিমান কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়।
চীনা দূতাবাস জানিয়েছে, দুটি বিমানে মোট ১৩ হাজার ২০০টি ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হয়েছে। এসব সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে তাঁবু, কম্বল, স্লিপিং ব্যাগ, শুকনো খাবার ও বিস্কুট এবং প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জরুরি প্রয়োজন মেটানো এবং উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তার জন্য এসব সামগ্রী পাঠানো হয়েছে।
চীনের সিচুয়ান প্রদেশের চেংদু শুয়াংলিউ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান দুটি কাঠমান্ডুর উদ্দেশে যাত্রা করে। প্রায় তিন ঘণ্টার বিমানযাত্রার পর স্থানীয় সময় সকাল ৭টার দিকে বিমানগুলো ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
বিমানবন্দরে ত্রাণ হস্তান্তর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নেপালে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ঝাং মাওমিং এবং নেপালের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনমন্ত্রী মহাবীর পুন। নেপালের প্রতিনিধি ও কর্মকর্তারা চীনা ত্রাণসামগ্রী গ্রহণ করেন।
শুধু ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েই থেমে থাকেনি চীন। ভয়াবহ বন্যায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে বিশেষজ্ঞ দলও পাঠিয়েছে দেশটি।
রোববারের দুটি বিমানে চারজন চীনা সুড়ঙ্গ উদ্ধার বিশেষজ্ঞ এবং প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম নেপালে পৌঁছেছে। এর আগে শনিবার আরও পাঁচজন চীনা সুড়ঙ্গ বিশেষজ্ঞ হেলিকপ্টারে করে চীন-নেপাল সীমান্তের কেরুং এলাকা থেকে দুর্যোগকবলিত অঞ্চলে পৌঁছে উদ্ধারকাজে যুক্ত হন। ফলে নেপালে চীনের পাঠানো সুড়ঙ্গ উদ্ধার বিশেষজ্ঞের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে নয়জনে।
বিশেষজ্ঞরা বন্যায় প্লাবিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে থাকা শ্রমিকদের উদ্ধারে নেপালি উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে কাজ করছেন। আরও চারজন বিশেষজ্ঞ পাঠানোর প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে বলে চীনা দূতাবাস জানিয়েছে।
গত ২৬ আগস্ট নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর বন্যা ও ভূমিধসে দেশটির বিভিন্ন এলাকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন অবকাঠামো ধ্বংসের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দুর্যোগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে শ্রমিকদের আটকে পড়া। উদ্ধারকারীরা পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে তাদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। চীন ও ভারত থেকে আসা বিশেষজ্ঞ দলও এই অভিযানে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সকাল পর্যন্ত ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ৭৩৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং প্রায় ২ হাজার ৪৯৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তবে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।
রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালের পাশাপাশি তিব্বতেও এই দুর্যোগে ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছে এবং মোট মৃতের সংখ্যা প্রায় ৮০০-র কাছাকাছি পৌঁছেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ এবং নতুন করে বন্যার আশঙ্কা উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তুলছে।
নেপালের ভয়াবহ দুর্যোগ মোকাবিলায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা সহায়তার হাত বাড়িয়েছে। প্রতিবেশী ভারতও ত্রাণসামগ্রী ও বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে। রোববার ভারতের চতুর্থ ত্রাণবাহী ফ্লাইট নেপালে পৌঁছায়; এর মাধ্যমে দেশটির মোট ত্রাণ সহায়তার পরিমাণ আরও বেড়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠান নেপালের দুর্যোগ মোকাবিলা ও পুনর্বাসনে সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।
চীনের পাঠানো ত্রাণসামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সুড়ঙ্গ উদ্ধারে চীনা বিশেষজ্ঞ ও সরঞ্জাম যুক্ত হওয়ায় আটকে থাকা শ্রমিকদের উদ্ধারের প্রচেষ্টাও আরও জোরদার হয়েছে।
আরও পড়ুন:







