হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নেপাল ও চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় মৃতের সংখ্যা প্রায় ৮০০-তে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে ৩ হাজারের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। বুধবারের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর চতুর্থ দিনেও চলছে উদ্ধার অভিযান। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, কাদা, ধ্বংসস্তূপ ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধারকাজে চরম বেগ পেতে হচ্ছে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ৭৮১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ২ হাজার ৫০২ জন নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যদিকে চীনের তিব্বত অঞ্চলের গিরং কাউন্টিতে ১৬ জন নিহত এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজের খবর পাওয়া গেছে। দুই দেশের সরকারি হিসাব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ৭৯৭, আর নিখোঁজের সংখ্যা ৩ হাজারের বেশি
গত ২৬ আগস্ট নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও ভয়াবহ ভূমিধসের সূত্রপাত হয়। বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায় ঘরবাড়ি, সড়ক ও সেতু। নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় বহু জনপদ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে নেপালের রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিংসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ত্রিশূলী ও ভোতে কোশি নদী অববাহিকায় বন্যার স্রোত সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। বহু জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নেপালে নিখোঁজদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। বিভিন্ন দেশের পর্যটক, শ্রমিক ও তীর্থযাত্রী এই দুর্যোগে নিখোঁজ হয়েছেন। চীনের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিকের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
এ কারণে বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের সন্ধানে নেপাল ও চীনের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। উদ্ধারকারী দলগুলো ধ্বংসস্তূপ ও নদীর তীরবর্তী এলাকায় ব্যাপক তল্লাশি চালাচ্ছে।
বন্যার কারণে বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে শ্রমিকরা আটকা পড়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে আপার ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকায়, যেখানে শত শত শ্রমিক আটকা থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গের মুখ থেকে পানি ও কাদা সরানোর পাশাপাশি বিকল্প পথ দিয়ে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। নেপালি বাহিনীর সঙ্গে চীন ও অন্যান্য দেশের বিশেষজ্ঞরাও উদ্ধারকাজে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছেন।
দুর্যোগের চতুর্থ দিনেও পাহাড়ি এলাকায় আবহাওয়ার পরিস্থিতি পুরোপুরি অনুকূলে আসেনি। ভারী বৃষ্টি, নদীর পানির উচ্চতা এবং ভূমিধসের আশঙ্কা উদ্ধারকারী দলগুলোর জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।
এ ছাড়া দুর্গম পাহাড়ি সড়কের বিভিন্ন অংশ ধসে যাওয়ায় ভারী উদ্ধার সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক জায়গায় হেলিকপ্টারের মাধ্যমে উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে।
প্রথম দফার বন্যার ক্ষত কাটিয়ে ওঠার আগেই নেপালে নতুন করে বন্যার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। নদীর পানি আবারও বাড়তে শুরু করায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ ও উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
চীন সীমান্তের উজান এলাকায় একটি বড় জলাধারসদৃশ অংশ তৈরি হওয়ায় সেটি ভেঙে পড়লে নতুন করে ভয়াবহ পানির স্রোত তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। ফলে উদ্ধারকারীদের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনও সম্ভাব্য নতুন বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ভয়াবহ এই দুর্যোগে নেপাল ও চীনের বিস্তীর্ণ এলাকার ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সরকারি ও আন্তর্জাতিক হিসাব থেকে জানা গেছে। বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
বন্যায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় দুর্গত এলাকায় খাদ্য, পানি, ওষুধ ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা এরই মধ্যে নেপালে পৌঁছাতে শুরু করেছে।
বন্যা ও ভূমিধসে উদ্ধার হওয়া অনেক মরদেহ দীর্ঘ সময় কাদা ও পানির নিচে থাকার কারণে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মরদেহের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন স্থানে মর্গের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনদের কাছে মরদেহ শনাক্ত করতে কর্তৃপক্ষ ছবি ও অন্যান্য তথ্য প্রকাশ করছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য উদ্ধার হওয়া মরদেহ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং হিমবাহের অস্থিতিশীলতা এ ধরনের আকস্মিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। এবারের দুর্যোগের সঙ্গে হিমবাহ ধস ও পরবর্তী পানির প্রবল স্রোতের সম্পর্ক রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নেপালের মতো পাহাড়ি ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে এ ধরনের দুর্যোগ ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিজ্ঞানীরা।
সূত্র: রয়টার্স
আরও পড়ুন:







