ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর নেপালে একের পর এক মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে। নদীর স্রোতে ভেসে বহু মরদেহ শত শত কিলোমিটার দূরে চিতওয়ান জেলায় পৌঁছেছে। মরদেহের সংখ্যা এতটাই বেড়েছে যে হাসপাতালের মর্গ ও মরদেহ সংরক্ষণের ব্যবস্থা প্রায় অপ্রতুল হয়ে পড়েছে। ফলে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ শনাক্তের জন্য ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে অস্থায়ীভাবে গণকবর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
সর্বশেষ সরকারি হিসাবে, নেপালে বন্যা ও ভূমিধসে ৯০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৪,২৪৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধারকাজ অব্যাহত থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ-মধ্য নেপালের চিতওয়ান জেলার দেবঘাটের একটি বনাঞ্চল এখন পরিণত হয়েছে অস্থায়ী সমাধিস্থলে। দুর্যোগের কয়েক দিন পর নদী থেকে উদ্ধার করা বহু মরদেহ সেখানে নেওয়া হচ্ছে। রয়টার্স জানিয়েছে, শনিবার সেখানে ৯৬টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ দাফন করা হয় এবং পরদিন আরও শতাধিক মরদেহ দাফনের পরিকল্পনা ছিল।
স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনেক মরদেহ এতটাই পচে গেছে যে স্বাভাবিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার কারণে পচন দ্রুত হচ্ছে। মরদেহ দীর্ঘ সময় খোলা অবস্থায় পড়ে থাকলে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
গণকবর দেওয়া হলেও কর্তৃপক্ষ মরদেহের পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া বন্ধ করছে না। প্রতিটি মরদেহের ডিএনএ নমুনা, ছবি ও অন্যান্য শনাক্তকারী তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। দাফনের স্থানও নথিভুক্ত করা হচ্ছে এবং মরদেহের জন্য পৃথক শনাক্তকরণ নম্বর রাখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে কোনো পরিবার নিখোঁজ স্বজনের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারলে এসব তথ্যের ভিত্তিতে মরদেহ শনাক্ত করার চেষ্টা করা হবে।
এই ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে পরিবারগুলোর কাছে পরে মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করার একটি সুযোগ থাকছে। তবে ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যে প্রিয়জনকে খুঁজতে আসা স্বজনদের জন্য পরিস্থিতিটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছে।
বন্যার তীব্র স্রোতে বহু মানুষ, ঘরবাড়ি ও যানবাহন ভেসে গেছে। বিশেষ করে ভোতেকোশি নদীর স্রোতে মরদেহগুলো মূল দুর্যোগস্থল থেকে অনেক দূরে চিতওয়ান পর্যন্ত চলে এসেছে। উদ্ধারকারীরা নদীর তীর, বনাঞ্চল এবং কাদামাটির স্তূপ থেকে মরদেহ উদ্ধার করছেন।
কিছু মরদেহ উদ্ধারের সময় কয়েক দিন ধরে পানিতে ডুবে ছিল বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। এতে মরদেহের অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যায় এবং ফরেনসিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজতে হাসপাতাল, উদ্ধারকেন্দ্র ও বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যালয়ে ভিড় করছেন পরিবারের সদস্যরা। কেউ প্রিয়জনের জীবিত থাকার আশায় অপেক্ষা করছেন, আবার কেউ মরদেহ শনাক্তের আশায় এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছেন।
অন্যদিকে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মরদেহ আসায় স্থানীয় মর্গ ও মরদেহ সংরক্ষণব্যবস্থার ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত মরদেহের নমুনা সংগ্রহ করে অস্থায়ী দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি শত শত নিখোঁজ মানুষের সন্ধানেও অভিযান চলছে। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকে থাকা শ্রমিকেরা। নেপালের হিসাবে ৯৩৩ জন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী নিখোঁজ রয়েছেন। ধসে পড়া মাটি ও ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে তাদের উদ্ধারে নেপাল, ভারত ও চীনের উদ্ধারকারী দল কাজ করছে।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, কাদামাটি, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক এবং নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কায় উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
নেপালের এই দুর্যোগে শুধু প্রাণহানিই নয়, ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে। বন্যার পানিতে সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রেড ক্রসের হিসাবে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সূত্র: রয়টার্স
আরও পড়ুন:







