নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। দেশটির নুয়াকোট জেলার বিদুর পৌরসভার-১০ নম্বর ওয়ার্ডের বেত্রাবতী এলাকায় একটি বাড়ি থেকে একসঙ্গে ২৪টি মরদেহ উদ্ধার করেছেন উদ্ধারকর্মীরা। ধ্বংসস্তূপ ও কাদার নিচে চাপা পড়ে এসব মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। দুর্গম ও কাদায় আচ্ছাদিত এলাকায় উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে একপর্যায়ে একটি বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচে বিপুলসংখ্যক মরদেহের সন্ধান পান উদ্ধারকারীরা।
নুয়াকোটের বেত্রাবতী এলাকাটি সাম্প্রতিক বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর একটি। প্রবল স্রোত, কাদা ও ধ্বংসাবশেষে বহু ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর বিভিন্ন স্থানে উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হলে একটি বাড়ির ভেতর থেকে ২৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারকারী দলগুলো এখনো ওই অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে নিখোঁজদের সন্ধানে তল্লাশি চালাচ্ছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। সর্বশেষ রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালে মৃতের সংখ্যা ৯৮৭ জনে পৌঁছেছে এবং প্রায় ৪ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। একই সঙ্গে জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে আটকে থাকা শত শত কর্মীকেও উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছাতে উদ্ধারকারীরা অস্থায়ী সেতু নির্মাণ করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা সচল করার পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহও পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
বন্যার ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে নেপালের পার্বত্য অঞ্চলে। বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখানে কর্মরত অনেকে আটকা পড়েছেন। রয়টার্স জানিয়েছে, ৬৩৯ জনের বেশি মানুষ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে আটকা পড়েছিলেন এবং তাদের মধ্যে শত শত মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে।
দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড, ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়ক এবং সেতুর কারণে উদ্ধার অভিযানও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় পৌঁছাতে উদ্ধারকারী দলকে বিকল্প পথ তৈরি করতে হচ্ছে।
এই ভয়াবহ বন্যার পেছনে হিমবাহ ধস বা হিমবাহ-সম্পর্কিত আকস্মিক পানিপ্রবাহের ভূমিকা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে ঘটনাটিকে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্ভাব্যভাবে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও হিমবাহের পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন।
বিপর্যয়ের পর নেপালকে উদ্ধার ও ত্রাণকাজে সহায়তা করছে প্রতিবেশীসহ বিভিন্ন দেশ। ভারত ও চীন উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করছে। চীন বিশেষ সরঞ্জাম ও কর্মী পাঠিয়েছে, যার মধ্যে ডিএনএ পরীক্ষার সরঞ্জামও রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়াও একটি ৪৪ সদস্যের দল পাঠিয়েছে।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং উদ্ধার হওয়া মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগে বন্যার পানিতে ভেসে আসা বিপুলসংখ্যক মরদেহ নিয়ে নেপালের বিভিন্ন এলাকায় মর্গ ও শনাক্তকরণ ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
একটি বাড়ি থেকেই ২৪টি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নেপালের ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মাত্রা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। হাজারো মানুষ এখনো নিখোঁজ থাকায় স্বজনদের অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে। উদ্ধারকারী দলগুলো ধ্বংসস্তূপ, নদীর তীর ও কাদামাটির নিচে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের ধারণা, দুর্গম এলাকাগুলোতে পৌঁছানো এবং নিখোঁজদের সন্ধান পাওয়া গেলে বন্যায় প্রাণহানির প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হবে। এরই মধ্যে মৃতের সংখ্যা প্রায় এক হাজারে পৌঁছে যাওয়ায় নেপালের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত হয়েছে এই বন্যা।
সূত্র: নেপাল নিউজ
আরও পড়ুন:







