News Ticker
221.png

নেপাল-চীনে ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা ১০০০ ছাড়াল

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৫:৪৩

শেয়ার

শেয়ার

নেপাল-চীনে ভয়াবহ বন্যায় মৃতের সংখ্যা ১০০০ ছাড়াল
ছবি: সংগৃহীত

হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নেপাল ও চীনে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়েছে। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত দুই দেশের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ দুর্যোগে অন্তত ১ হাজার ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ৪৬২ জন। দুর্গম এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধার অভিযান চালাতে গিয়ে চরম বাধার মুখে পড়ছেন উদ্ধারকর্মীরা। 

গত ২৬ আগস্ট হিমালয়ের উচ্চাঞ্চলে হিমবাহ ধসের পর বিপুল পরিমাণ পাথর, বরফ ও গলিত পানি নিচের উপত্যকায় নেমে আসে। এর ফলে নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যে নদীগুলোর পানি ভয়াবহভাবে বেড়ে গিয়ে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন অবকাঠামো ভাসিয়ে নেয়। 

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (NDRRMA) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে ৯৮৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৩ হাজার ৯১৬ জন। নিখোঁজদের মধ্যে ৫৮৩ জন বিদেশি নাগরিক। 

নেপালের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে নুয়াকোট, রাসুয়া ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকার বিভিন্ন অঞ্চল। বন্যার পানির সঙ্গে নেমে আসা কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষে বহু বসতি কার্যত মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।

নুয়াকোট জেলার বেত্রাবতী এলাকায় একটি বাড়ির ধ্বংসস্তূপ থেকে একসঙ্গে ২৪টি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে। উদ্ধারকর্মীরা দুর্গম এলাকাগুলোতে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন মরদেহের সন্ধান পাচ্ছেন। 

চীনের তিব্বত অঞ্চলেও বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ প্রকাশিত হিসাবে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৪৬ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক। 

নেপাল ও চীনের হিসাব একত্র করলে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ৩ জনে। দুই দেশে এখনো নিখোঁজ ৪ হাজার ৪৬২ জন হওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

বন্যার পর সবচেয়ে বড় উদ্ধার চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে নেপালের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে। পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত কয়েকটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের টানেল কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষে আটকে গেছে।

নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত শত শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকে টানেলের ভেতরে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকারীরা ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে টানেল থেকে কাদা ও পাথর সরানোর চেষ্টা করছেন।

প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো থেকে ২৭৯ জন কর্মীকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে আরও অনেকের সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি।

বিপর্যয়ের পর নেপালে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য উদ্ধারকারী দল হেলিকপ্টার ও উড়োজাহাজ ব্যবহার করে দুর্গম এলাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।

নেপালি কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এখন পর্যন্ত ১১ হাজার ৮১৪ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে বহু এলাকায় সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় স্থলপথে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

কিছু এলাকায় সড়ক যোগাযোগ পুনঃস্থাপন করা গেলেও পাহাড়ি অঞ্চলের বহু জায়গা এখনো বিচ্ছিন্ন রয়েছে। উদ্ধারকাজের পাশাপাশি খাবার, পানি, ওষুধ ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২৬ আগস্ট হিমালয়ের উচ্চাঞ্চলে একটি বড় ধরনের হিমবাহ ধসের পর বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও গলিত পানি নিচের দিকে নেমে আসে। এর সঙ্গে তৈরি হয় প্রবল পানির স্রোত, যা একের পর এক নদী ও উপত্যকার মধ্য দিয়ে ছুটে যায়।

পাহাড় থেকে নেমে আসা এই প্রবল স্রোত নদীর পানির সঙ্গে মিশে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে। অনেক এলাকায় পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর ও কাদা নেমে আসায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও বেড়ে যায়।

স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, হিমবাহের নিচের শিলাস্তরের ধসও এই বিপর্যয়ের সূত্রপাতের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে।

বন্যার পানির স্রোতে বহু সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে দুর্গম অঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী কাঠমান্ডুসহ অন্যান্য এলাকার যোগাযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

কোথাও কোথাও নতুন করে অস্থায়ী সেতু নির্মাণ করে উদ্ধারকারী দলকে দুর্গত এলাকায় পৌঁছাতে হচ্ছে। ভারত ও চীনও উদ্ধার ও যোগাযোগ পুনঃস্থাপনে নেপালকে সহযোগিতা করছে।

যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় দুর্গত মানুষদের কাছে ত্রাণ পৌঁছানোও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নেপালে নিখোঁজ ৩ হাজার ৯১৬ জনের মধ্যে ৫৮৩ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। চীনের তিব্বত অঞ্চলে নিখোঁজ ৫৪৬ জনের মধ্যে আরও ২৬১ জন বিদেশি। ফলে দুই দেশে নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।

দুর্যোগের সময় হিমালয় অঞ্চলে পর্যটক, তীর্থযাত্রী ও বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের উপস্থিতি থাকায় তাদের সন্ধানে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্তৃপক্ষও নেপাল ও চীনের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।

এই দুর্যোগ হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও হিমবাহের দ্রুত পরিবর্তনের কারণে পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিক বন্যা, হিমবাহ ধস ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে বলে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহও এই বিপর্যয়কে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। 

বিপর্যয়ের সপ্তম দিনেও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের টানেলে আটকা পড়া কর্মীদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তবে টানেলের ভেতরে বিপুল পরিমাণ কাদা ও পাথর জমে থাকায় উদ্ধারকাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে এগোচ্ছে। উদ্ধারকারীরা ভারী যন্ত্রপাতি, ড্রোন ও অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে জীবিতদের সন্ধান করছেন।

সূত্র: আল জাজিরা

ChannelNRB Footer