বিধ্বংসী বন্যায় বিপর্যস্ত নেপাল। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ, কাদা আর স্বজন হারানোর আহাজারি। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নতুন করে নাড়া দিয়েছে মানুষের হৃদয়। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, এক খুদে বালক তার ছোট বোনকে পিঠে নিয়ে বিধ্বস্ত এলাকার মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে দাবি করা হয়েছে, শিশুটি মা-বাবাকে খুঁজছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ভরা একটি পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে শিশুটি। তার পিঠে বাঁধা রয়েছে ছোট্ট এক শিশু। বোনটি কাঁদছে, আর দাদাকে বারবার চারপাশে তাকাতে দেখা যাচ্ছে। শিশুটির মুখ ও শরীরেও আঘাতের চিহ্ন বা আঁচড়ের মতো দাগ দেখা যায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভিডিওটি ৩০ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একাধিক পোস্টে দাবি করা হয়, নেপালের বন্যার পর শিশুটি তার ছোট বোনকে নিয়ে মা-বাবার সন্ধান করছে। তবে এখন পর্যন্ত ভাই-বোন দুটির নাম, পরিচয় বা তারা ঠিক কোন এলাকার—এসব তথ্য নিশ্চিত করা যায়নি। এমনকি ভিডিওটির সঙ্গে করা মা-বাবাকে খোঁজার দাবিটিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও আকস্মিক প্লাবনে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার বহু গ্রাম, সড়ক, সেতু ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিপর্যয়ের পর হাজারো মানুষ নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে ছুটছেন।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে এবং কয়েক হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ। উদ্ধারকারীরা দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে হিমশিম খাচ্ছেন। হাসপাতাল ও মরদেহ শনাক্তকরণ কেন্দ্রগুলোতেও তৈরি হয়েছে তীব্র চাপ।
নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে অনেক পরিবার হাসপাতাল, উদ্ধারকেন্দ্র ও মরদেহ সংরক্ষণকেন্দ্রে ঘুরছেন। কোথাও কোথাও শনাক্ত না হওয়া মরদেহের ছবি দেখিয়ে স্বজনদের পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
নেপালের ভাইরাল ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে তুলনা করা হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের নাগাসাকিতে তোলা একটি ঐতিহাসিক ছবির সঙ্গে।
১৯৪৫ সালে নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার পর মার্কিন মেরিন কোরের আলোকচিত্রী জো ও’ডনেল একটি কিশোরের ছবি তুলেছিলেন। সেই ছবিতে দেখা যায়, এক কিশোর তার পিঠে মৃত ছোট ভাইকে বহন করে একটি দাহস্থলের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। ছবিটি পরবর্তীতে যুদ্ধের ভয়াবহতা ও শিশুদের ওপর তার নির্মম প্রভাবের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে।
নেপালের ভাইরাল ভিডিওতে অবশ্য পরিস্থিতি আলাদা। এখানে পিঠে থাকা শিশুটি জীবিত বলেই ভিডিওতে দেখা যায়। ফলে দুটি দৃশ্যের সরাসরি তুলনা ঐতিহাসিক অর্থে যথাযথ নয়। তবে দুই ছবির মধ্যে যে মিলটি মানুষের আবেগকে নাড়া দিচ্ছে, তা হলো—বিপর্যয়ের মুহূর্তে নিজের চেয়েও ছোট একজনকে আগলে রাখার শিশুর দায়িত্ববোধ।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনদের অনেকে শিশুটিকে ‘ছোট্ট নায়ক’ বলে অভিহিত করেছেন। কেউ নেপালের মানুষের জন্য প্রার্থনা করেছেন, আবার কেউ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার সেই ঐতিহাসিক ছবির কথা স্মরণ করেছেন। অনেকে জাপানের অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র ‘Grave of the Fireflies’-এর দুই ভাইবোন সেতা ও সেতসুকোর কথাও তুলেছেন।
নেপালের এই দুর্যোগে কেউ হারিয়েছেন ঘর, কেউ স্বজন, আবার কেউ এখনও অপেক্ষা করছেন নিখোঁজ পরিবারের সদস্য ফিরে আসবেন—এই আশায়। এমন পরিস্থিতিতে পিঠে ছোট বোনকে নিয়ে হাঁটা এক শিশুর দৃশ্য মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলেছে।
শিশুটির পরিচয় এখনও অজানা। মা-বাবার সঙ্গে তার শেষ পর্যন্ত দেখা হয়েছিল কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের সেই ভিডিও যেন পুরো দুর্যোগের একটি মানবিক প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে—যেখানে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মাঝেও বড় ভাই নিজের ছোট বোনকে ছেড়ে যায়নি।
নাগাসাকির সেই ঐতিহাসিক ছবির মতোই নেপালের এই দৃশ্যও মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধ হোক কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ—বিপর্যয়ের সবচেয়ে নির্মম আঘাত অনেক সময় গিয়ে পড়ে শিশুদের ওপর। আর সেই অন্ধকারের মধ্যেও এক শিশুর আরেক শিশুকে আগলে রাখার দৃশ্য হয়ে ওঠে মানবিকতার এক শক্তিশালী প্রতীক।
আরও পড়ুন:







