নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে কর্মরত প্রায় ৯০০ শ্রমিকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন টানেলের ভেতরে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষে টানেলের প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
নিখোঁজ শ্রমিকদের সন্ধানে এখন পাহাড়ের ভেতরে পথ তৈরি করতে বিস্ফোরণ ঘটানো, টানেলে বাতাস প্রবেশ করানো এবং ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে কাদা-পাথর সরানোর কাজ চলছে। নেপালের পাশাপাশি ভারত, চীন ও অন্যান্য দেশের বিশেষজ্ঞরাও উদ্ধার অভিযানে সহায়তা করছেন।
গত বুধবার হিমালয় অঞ্চলে একটি হিমবাহ-সংক্রান্ত ধসের পর আকস্মিক বন্যা ও প্রবল পানির স্রোত নেপাল-চীন সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকায় আঘাত হানে। পাহাড় থেকে নেমে আসা বিপুল পানি, পাথর ও কাদার স্রোতে সড়ক, সেতু, বসতি এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নেপালের রাশুওয়া ও নুওয়াকোট জেলার অন্তত ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিকদের বড় একটি অংশ ঘটনার পর থেকে নিখোঁজ। সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, মোট নিখোঁজ শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৯০০।
উদ্ধারকারী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, নিখোঁজ শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন বড় আকারের জলবিদ্যুৎ টানেলের ভেতরে আশ্রয় নিয়ে থাকতে পারেন। এসব টানেল সাধারণত পানি নিয়ন্ত্রণ ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার অংশ এবং অনেক ক্ষেত্রে ভেতর দিয়ে ট্রাক চলাচলের মতো জায়গা রয়েছে। ফলে সেখানে কিছু শ্রমিক বেঁচে থাকার সুযোগ রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
তবে দীর্ঘ সময় ধরে খাবার, পানি ও পর্যাপ্ত অক্সিজেনের সংকট দেখা দিলে পরিস্থিতি দ্রুত সংকটজনক হয়ে উঠতে পারে। উদ্ধারকারীরা তাই সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছেন।
প্রবল বন্যার পানির সঙ্গে নেমে আসা বিশাল পাথর ও কাদায় টানেলের প্রবেশপথগুলো অনেক জায়গায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু এলাকায় এত বড় পাথর জমেছে যে সাধারণ খননযন্ত্র দিয়ে তা সরানো সম্ভব হচ্ছে না।
এ কারণে উদ্ধারকারীরা পাহাড়ের ভেতরে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পাথর সরিয়ে নতুন পথ তৈরির চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি টানেলের ভেতরে বাতাস পাঠানোর ব্যবস্থাও করা হচ্ছে, যাতে সেখানে কেউ জীবিত থাকলে অক্সিজেনের ঘাটতিতে না পড়েন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে রাশুওয়া জেলার আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে। সেখানে অন্তত ৫৭৬ জনের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৩০০ জন টানেলের ভেতরে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ত্রিশূলী-৩ প্রকল্প এলাকাতেও উদ্ধারকারীরা টানেলের ভেতরে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। নেপালি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে প্রায় ১৫ মিটার নিচে নামার চেষ্টা চলছে।
উদ্ধার অভিযান যত দীর্ঘ হচ্ছে, নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবারের উদ্বেগ ততই বাড়ছে। অনেক পরিবার এখনো বিশ্বাস করছেন, তাদের স্বজনরা টানেলের ভেতরে নিরাপদ কোনো স্থানে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন।
উদ্ধারকারীরাও পুরোপুরি আশা ছাড়ছেন না। বিশেষজ্ঞদের মতে, টানেলের কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে বাইরের ভয়াবহ বন্যার তুলনায় তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত জায়গা তৈরি করতে পারে। তবে কাদা ও পাথরে টানেলের বড় অংশ বন্ধ হয়ে থাকায় সেখানে পৌঁছানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী এলাকায় এই দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা ইতোমধ্যে ১,০০০ ছাড়িয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ। নেপালের দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সূত্র: এপি নিউজ
আরও পড়ুন:







