News Ticker
221.png

নেপালের বন্যায় মাত্র ১৪ মিনিটের সতর্কবার্তায় বাঁচল ৯০০ শিক্ষার্থীর প্রাণ

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:১২

শেয়ার

শেয়ার

নেপালের বন্যায় মাত্র ১৪ মিনিটের সতর্কবার্তায় বাঁচল ৯০০ শিক্ষার্থীর প্রাণ
ছবি: সংগৃহীত

মাত্র ১৪ মিনিট। এই অল্প সময়ের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল—স্কুলের ক্লাস বন্ধ করে শত শত শিক্ষার্থীকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হবে, নাকি পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হওয়ার অপেক্ষা করা হবে। শেষ পর্যন্ত দ্রুত সিদ্ধান্তই বাঁচিয়ে দিল নেপালের ৯০০-এর বেশি শিক্ষার্থী ও ১৬ জন শিক্ষক-কর্মীর প্রাণ।

নেপালের নুওয়াকোট জেলার বিদুরে অবস্থিত ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গত বুধবার ঘটে এই ঘটনা। ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার ঢেউ যখন ত্রিশূলী উপত্যকার দিকে ধেয়ে আসছিল, তখন স্কুল কর্তৃপক্ষের হাতে ছিল মাত্র কয়েক মিনিটের সতর্কতা। সেই সতর্কবার্তা পেয়েই প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি ক্লাস বন্ধ করে সবাইকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন।

ঘটনার সময় স্কুলে ক্লাস চলছিল। হঠাৎ স্কুলের হিসাবরক্ষক ছুটে এসে প্রধান শিক্ষককে জানান—বন্যার পানি দ্রুত এগিয়ে আসছে।

এর আগে তিনি রাশুয়া এলাকায় থাকা এক স্বজনের কাছ থেকে ফোন পেয়েছিলেন। ওই অঞ্চলেই তখন ভয়াবহ বন্যার আঘাত শুরু হয়েছিল। ফোনে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তিনি দ্রুত স্কুলে ফিরে এসে সবাইকে সতর্ক করেন।

প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি বুঝতে পারেন, আর অপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

তিনি সঙ্গে সঙ্গে ক্লাস বন্ধ করে ঘণ্টা বাজানোর নির্দেশ দেন। শিক্ষার্থীদের দ্রুত স্কুল ভবন থেকে বের করে উঁচু ও নিরাপদ জায়গায় নেওয়া শুরু হয়। একই সঙ্গে স্কুলের দিকে আসা বাসগুলোকেও নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

স্কুলে মোট শিক্ষার্থী ছিল প্রায় ১ হাজার ৬০০ জন। তবে সতর্কবার্তা পাওয়ার সময় ক্যাম্পাসে উপস্থিত ছিল ৯০০-এর বেশি শিক্ষার্থী। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন ১৬ জন শিক্ষক ও কর্মী।

সবাইকে বের করে আনার কাজ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ হয়ে ওঠে। আতঙ্কে একজন শিক্ষার্থী অজ্ঞান হয়ে যায়। কেউ অভিভাবকের মোটরসাইকেলে, কেউ বাসে এবং অনেকে দৌড়ে উঁচু জায়গার দিকে যেতে শুরু করে।

প্রধান শিক্ষক জানান, শেষ বাসটি কাছের একটি সেতু পার হওয়ার সময়ই ভয়াবহ পানির স্রোত এলাকায় ঢুকে পড়ে। মাত্র কিছুক্ষণ পর পুরোনো একটি সেতু পানির তোড়ে ভেঙে যায়।

অর্থাৎ, সতর্কবার্তাটি যদি কয়েক মিনিট দেরিতে আসত, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত।

রাজেন্দ্র দাওয়াদির জন্য ঘটনাটি আরও আবেগঘন। তিনি নিজেও একসময় এই স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলেন। পরে সেই স্কুলেরই প্রধান শিক্ষক হন।

কিন্তু শিক্ষার্থীদের প্রাণ বাঁচানোর কয়েক মিনিটের মধ্যেই স্কুলটি আর থাকল না।

ত্রিভুবন ত্রিশূলী মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি ত্রিশূলী নদী ও একটি জলবিদ্যুৎ খালের মাঝামাঝি এলাকায় অবস্থিত ছিল। ভয়াবহ বন্যার স্রোত পুরো এলাকাকে তছনছ করে দেয়। স্কুল ভবনটি ধ্বংস হয়ে যায় এবং এর আগের অবস্থান এখন কার্যত নদীর তলদেশের অংশ হয়ে গেছে। 

দাওয়াদি এখন কর্তৃপক্ষের কাছে নিরাপদ স্থানে দ্রুত স্কুলটি পুনর্নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।

শিক্ষার্থীদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তের জন্য প্রধান শিক্ষককে এখন স্থানীয় বাসিন্দারা নায়ক হিসেবে দেখছেন।

এক অভিভাবক জানান, তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন তাঁর মেয়েকে হয়তো আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মেয়েটি নিরাপদে ফিরে আসে।

অনেক অভিভাবকের মতে, প্রধান শিক্ষক যদি সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব না দিয়ে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেন, তাহলে কয়েকশ শিক্ষার্থীর জীবন ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়ত। 

একই সময়ে আশপাশের অনেক মানুষ এত দ্রুত সতর্কবার্তা পাননি। ফলে বন্যার ভয়াবহ স্রোতে বহু মানুষ নিখোঁজ হন।

স্কুলের হিসাবরক্ষকও সতর্কবার্তা দেওয়ার পর নিজের বাবা-মাকে বাঁচাতে ছুটে যান। তিনি বাবাকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যেতে পারলেও মাকে উদ্ধারের চেষ্টা করার সময় তাঁদের বাড়িটি পানির স্রোতে ভেসে যায়। তাঁর মা এখনো নিখোঁজ।

স্কুলের অন্তত একজন কর্মীকেও নিখোঁজ বলে জানানো হয়েছে।

২৬ আগস্ট হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধসের পর ভয়াবহ পানির স্রোত নেমে আসে। নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী এলাকায় এর প্রভাব পড়ে। ত্রিশূলী নদীসহ বিভিন্ন নদীতে পানির প্রবল স্রোত সৃষ্টি হয়ে বাড়িঘর, সেতু, সড়ক, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও অন্যান্য অবকাঠামো ধ্বংস করে।

সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, এই দুর্যোগে নেপাল ও আশপাশের এলাকায় মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়েছে এবং কয়েক হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ। উদ্ধারকারী দলগুলো দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে কাজ করছে।

সূত্র: রয়টার্স

ChannelNRB Footer