News Ticker
221.png

কঙ্গোতে ইবোলা মহামারিতে প্রাণহানির সংখ্যা ছাড়াল ৩ হাজার

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২১:২৬

শেয়ার

শেয়ার

কঙ্গোতে ইবোলা মহামারিতে প্রাণহানির সংখ্যা ছাড়াল ৩ হাজার
ছবি: সংগৃহীত

মধ্য আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে (ডিআর কঙ্গো) ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে ইবোলা মহামারি। দেশটির সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলমান প্রাদুর্ভাবে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ১৮৬ জনে।

ইবোলার এই প্রাদুর্ভাবকে কঙ্গোর ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ইবোলা প্রাদুর্ভাব হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে ২০১৮-২০২০ সালের প্রাদুর্ভাবটিই ছিল দেশটির সবচেয়ে ভয়াবহ; এবার মৃত্যুর সংখ্যা সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে। 

কঙ্গোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে চলতি বছরের মে মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে বর্তমান প্রাদুর্ভাব ঘোষণা করা হয়। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এর আগে থেকেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বর্তমানে দেশটির ছয়টি প্রদেশের ৬০টি স্বাস্থ্য অঞ্চলে ইবোলা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ইতুরি প্রদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। সরকারি হিসাবে, শুধু ইতুরিতেই ৫ হাজার ৬৫টি নিশ্চিত সংক্রমণ এবং ২ হাজার ৩০৫টি মৃত্যু হয়েছে। 

উত্তর কিভুতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সেখানে ৮৬৮টি নিশ্চিত সংক্রমণের বিপরীতে ৫৮৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। হাউত-উলে, তশোপো, দক্ষিণ কিভু ও বাস-উলে প্রদেশেও সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।

ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, নিশ্চিত আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুহার প্রায় ৪৮ শতাংশ।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনা না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো কঠিন হওয়ায় অনেক রোগী সময়মতো চিকিৎসা পাচ্ছেন না। 

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, মোট মৃত্যুর প্রায় ৬০ শতাংশ চিকিৎসাকেন্দ্রের বাইরে ঘটছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আক্রান্তদের শনাক্ত করা এবং তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের দ্রুত খুঁজে বের করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। 

বর্তমান প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী ভাইরাসটি হলো Bundibugyo ebolavirus। এটি ইবোলা ভাইরাসের একটি পৃথক প্রজাতি এবং এর আগে উগান্ডা ও কঙ্গোতে সংক্রমণ ঘটিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের জন্য এবারের প্রাদুর্ভাবের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে সরাসরি অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা এখনো সীমিত। তবে বিভিন্ন পরীক্ষামূলক টিকা ও চিকিৎসা নিয়ে কাজ চলছে। 

সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কঙ্গোর স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থাগুলো বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্বাস্থ্যকর্মীদের টিকাদানও শুরু হয়েছে।

এক্ষেত্রে Merck-এর Ervebo টিকা ব্যবহার করা হচ্ছে। টিকাটি মূলত Ebola Zaire প্রজাতির বিরুদ্ধে অনুমোদিত; Bundibugyo ভাইরাসের বিরুদ্ধে এর সুরক্ষা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে গবেষণা ও মূল্যায়ন চলছে।

কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলা সশস্ত্র সংঘাতও ইবোলা মোকাবিলায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক এলাকায় নিরাপত্তাহীনতার কারণে স্বাস্থ্যকর্মীদের চলাচল এবং আক্রান্ত এলাকায় নজরদারি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এর সঙ্গে রয়েছে দুর্বল স্বাস্থ্য অবকাঠামো, দুর্গম এলাকা, মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি অনাস্থা। এসব কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করা এবং তার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। 

২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে কঙ্গোতে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা মহামারিতে ২ হাজার ২৯৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সেটিই এতদিন দেশটির সবচেয়ে প্রাণঘাতী ইবোলা প্রাদুর্ভাব হিসেবে বিবেচিত ছিল।

চলতি বছরের প্রাদুর্ভাবে আগস্টের মাঝামাঝি সময়েই মৃত্যুর সংখ্যা ওই রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। এখন তা ৩ হাজারেরও বেশি হওয়ায় কঙ্গোর জন্য এটি নতুন ভয়াবহ মাইলফলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

কঙ্গোর সরকারকে সহায়তা করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা। সংক্রমণ শনাক্তকরণ, নমুনা পরীক্ষা, রোগীদের চিকিৎসা, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ এবং টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

তবে নতুন নতুন এলাকায় সংক্রমণ শনাক্ত হওয়া এবং আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর চাপও বাড়ছে। WHO-এর সাম্প্রতিক তথ্যেও প্রাদুর্ভাবের বিস্তার এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দ্রুত সংক্রমণ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কঙ্গোর বাইরে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর আগে চলমান প্রাদুর্ভাবের সময় উগান্ডাতেও Bundibugyo ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল।

তবে উগান্ডা আগস্টে টানা ৪২ দিন নতুন নিশ্চিত সংক্রমণ না পাওয়ার পর সেখানে প্রাদুর্ভাবের সমাপ্তি ঘোষণা করেছে। ফলে কঙ্গোর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা এখন আঞ্চলিক জনস্বাস্থ্যের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সূত্র: রয়টার্স

ChannelNRB Footer