যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রার ইতিহাসে বিরল এক ঘটনা ঘটেছে। প্রথমবারের মতো দায়িত্বে থাকা একজন জীবিত মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতিকৃতি সংবলিত ১ ডলারের মুদ্রা প্রকাশ্যে এসেছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি থাকা এই বিশেষ মুদ্রা যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা বার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ও ইউএস মিন্টের তথ্য অনুযায়ী, ‘President Donald J. Trump $1 Coin’ নামের মুদ্রাটি ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে বিক্রি শুরু হয়েছে। মুদ্রাটি আইনগতভাবে বৈধ মুদ্রা হলেও মূলত স্মারক ও সংগ্রহযোগ্য পণ্য হিসেবে বাজারে ছাড়া হয়েছে।
নতুন ১ ডলারের মুদ্রার সামনের অংশে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিকৃতি রয়েছে। এর ওপরে লেখা রয়েছে ‘LIBERTY’, আর নিচে রয়েছে ‘1776 ~ 2026’। পাশাপাশি মুদ্রাটিতে ‘IN GOD WE TRUST’ লেখা রয়েছে।
মুদ্রার অপর পাশে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সরকারি সিলমোহরের নকশা। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম বার্ষিকীকে তুলে ধরতে ‘250’-এর উল্লেখও রয়েছে।
ইউএস মিন্ট জানিয়েছে, সামনের অংশের নকশায় ট্রাম্পের প্রতিকৃতি ব্যবহার করা হয়েছে এবং মুদ্রাটি ২০২৬ সালের যুক্তরাষ্ট্রের সেমিকুইনসেন্টেনিয়াল বা ২৫০তম বার্ষিকী উদযাপনের অংশ।
যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রীতি হলো—জীবিত কোনো ব্যক্তির প্রতিকৃতি সরকারি মুদ্রায় ব্যবহার করা হয় না। ১৮৬৬ সালের একটি ফেডারেল আইন জীবিত ব্যক্তির প্রতিকৃতি মুদ্রায় ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার ভিত্তি তৈরি করেছিল।
তবে ইতিহাসে একেবারে কোনো নজির নেই—এমনটিও নয়। ১৯২৬ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলিজের প্রতিকৃতি একটি স্মারক মুদ্রায় ব্যবহৃত হয়েছিল। ফলে ট্রাম্পের মুদ্রাকে প্রায় এক শতাব্দী পর জীবিত প্রেসিডেন্টের প্রতিকৃতি ব্যবহারের বিরল ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্পের ছবি মুদ্রায় ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের বক্তব্য, জীবিত প্রেসিডেন্টের প্রতিকৃতি ব্যবহারের প্রচলিত নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে এই মুদ্রার নকশা সাংঘর্ষিক।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, ২০২৬ সালের সেমিকুইনসেন্টেনিয়াল উদযাপন উপলক্ষে বিশেষ ১ ডলারের মুদ্রা প্রকাশের অনুমোদনকারী আইন এই নকশার পথ তৈরি করেছে। ফলে বিষয়টি সরাসরি প্রচলিত মুদ্রা আইনের সাধারণ নিয়মের আওতায় পড়ে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
এ নিয়ে একটি মামলা মুদ্রাটি প্রকাশ ঠেকানোর চেষ্টা করলেও আদালত মূলত বাদীর মামলা করার অধিকার বা ‘স্ট্যান্ডিং’ নিয়ে প্রশ্ন তুলে আবেদন খারিজ করে। আদালত মুদ্রাটির বৈধতা নিয়ে চূড়ান্ত রায় দেয়নি।
মুদ্রাটি দেখতে সোনালি রঙের হলেও এতে প্রকৃত সোনা ব্যবহার করা হয়নি। এটি তামা, দস্তা, ম্যাঙ্গানিজ ও নিকেলের সংকর ধাতু দিয়ে তৈরি।
মুদ্রাটির অভিহিত মূল্য ১ ডলার হলেও ইউএস মিন্ট সংগ্রহকারীদের জন্য নির্দিষ্ট প্যাকেজে এটি অভিহিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করছে। ২৫টি মুদ্রার একটি রোলের দাম ৬১ ডলার এবং ১০০টি মুদ্রার একটি ব্যাগের দাম ১৫৪.৫০ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিক্রি শুরুর পর মুদ্রাটি নিয়ে সংগ্রহকারীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। ইউএস মিন্টের ওয়েবসাইটে বিক্রির সময় ক্রেতাদের ভার্চুয়াল অপেক্ষার সারিতেও যেতে হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
মুদ্রাটি যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা বার্ষিকী উদযাপনের অংশ হলেও ট্রাম্পের জীবদ্দশায় তার প্রতিকৃতি ব্যবহারের কারণে এটি ইতোমধ্যে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে।
মুদ্রাটি আইনগতভাবে বৈধ মুদ্রা হলেও এটি সাধারণ প্রচলনে কতটা ছড়িয়ে পড়বে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। মূলত সংগ্রহযোগ্য পণ্য হিসেবে বিক্রির কারণে এর বড় অংশ সংগ্রাহকদের কাছেই চলে যেতে পারে।
তবে যেহেতু মুদ্রাটির বৈধ মূল্য ১ ডলার, তাই ভবিষ্যতে এর কিছু অংশ সাধারণ মানুষের হাতেও পৌঁছাতে পারে। এ কারণে ট্রাম্পের প্রতিকৃতি থাকা মুদ্রাটি মার্কিন মুদ্রাব্যবস্থায় একটি ব্যতিক্রমী সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রায় সাধারণত ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মৃত ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি ব্যবহারের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। জীবিত প্রেসিডেন্টের ছবি ব্যবহার সেই প্রচলিত রীতির ব্যতিক্রম।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিকৃতি সংবলিত নতুন ১ ডলারের মুদ্রা তাই শুধু ২৫০তম স্বাধীনতা বার্ষিকীর স্মারক নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা নকশার দীর্ঘদিনের রীতি, আইন এবং প্রেসিডেন্টের সরকারি প্রতীক ব্যবহারের সীমা নিয়েও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সূত্র: ইউএস মিন্ট,
আরও পড়ুন:







