News Ticker
221.png

যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা থেকে ৮৬ টন স্বর্ণ লন্ডনে নিল নেদারল্যান্ডস

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:৩৭

শেয়ার

শেয়ার

যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা থেকে ৮৬ টন স্বর্ণ লন্ডনে নিল নেদারল্যান্ডস
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় রাখা স্বর্ণের বড় একটি অংশ লন্ডনে সরিয়ে নিয়েছে নেদারল্যান্ডস। গত ছয় মাসে প্রায় ৮৬ টন স্বর্ণ নিউইয়র্ক ও অটোয়া থেকে লন্ডনে স্থানান্তর করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডি নেদারল্যান্ডশে ব্যাংক (DNB)।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) এ তথ্য জানিয়ে DNB বলেছে, এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো সংকটের সময় স্বর্ণের মজুত দ্রুত ব্যবহার করার সক্ষমতা বাড়ানো এবং দেশের আর্থিক স্থিতিস্থাপকতা জোরদার করা।

DNB-এর ভাষ্য, বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে থাকা রিজার্ভ শুধু নিরাপদ জায়গায় সংরক্ষিত থাকাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজনের মুহূর্তে সেটি কত দ্রুত বাজারে ব্যবহার করা যাবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

এই বিবেচনায় নেদারল্যান্ডস তাদের স্বর্ণের একটি অংশ এমন জায়গায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেখান থেকে সংকটের সময় দ্রুত লেনদেন করা সম্ভব।

DNB বলেছে, ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের কাছে লন্ডনে রাখা স্বর্ণ বিশ্বের সবচেয়ে সহজে লেনদেনযোগ্য স্বর্ণের মধ্যে অন্যতম। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে এই স্বর্ণ দ্রুত বিক্রি বা অন্য কোনো আর্থিক কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।

DNB প্রেসিডেন্ট ওলাফ স্লেইপেনের ভাষ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বর্ণের মজুত সংকটকালে ব্যবহার করতে হবে বলে আশা করছে না। তবে সম্ভাব্য সংকটের জন্য প্রস্তুতি ও স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানো প্রয়োজন।

মোট প্রায় ৮৬ মেট্রিক টন স্বর্ণের সমপরিমাণ মজুত নিউইয়র্ক ও কানাডার অটোয়া থেকে লন্ডনে পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।

এর মধ্যে পুরো স্বর্ণ শারীরিকভাবে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পরিবহন করা হয়নি। DNB ঝুঁকি কমাতে ক্রয়-বিক্রয় এবং সীমিত শারীরিক পরিবহনের সমন্বিত পদ্ধতি ব্যবহার করেছে।

প্রায় ৫৯ টন স্বর্ণ নিউইয়র্কে বিক্রি করে লন্ডনে সমপরিমাণ স্বর্ণ কেনা হয়েছে। লন্ডনে কেনা স্বর্ণ ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের বাজারে ব্যবহারের উপযোগী মানদণ্ড পূরণ করে।

এ ছাড়া ২৭ টনের বেশি স্বর্ণ উত্তর আমেরিকা থেকে নেদারল্যান্ডসের জেইস্টে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সমপরিমাণ আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন স্বর্ণ জেইস্টের ভল্ট থেকে লন্ডনে পাঠানো হয়েছে।

এই পদ্ধতির ফলে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণের বার সরাসরি পরিবহন করে পুনরায় গলিয়ে নতুন করে মানসম্মত করার প্রয়োজন হয়নি।

নেদারল্যান্ডসের এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—দেশটির মোট স্বর্ণের মজুত কমেনি।

২০২৫ সালের শেষ নাগাদ DNB-এর কাছে মোট ৬১২ দশমিক ৪ টন স্বর্ণ ছিল। তখন এর মূল্য ছিল প্রায় ৭২ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউরো।

৮৬ টন স্বর্ণের পুনর্বিন্যাসের পরও মোট মজুত একই রয়েছে। পরিবর্তন হয়েছে শুধু বিভিন্ন দেশে স্বর্ণ রাখার অনুপাতের ক্ষেত্রে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ স্বর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর একটি হলো লন্ডন। এখানে বড় ব্যাংক, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বিনিয়োগকারী এবং স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা ওভার-দ্য-কাউন্টার বাজারে সরাসরি লেনদেন করেন।

ফলে লন্ডনে সংরক্ষিত স্বর্ণ প্রয়োজনের সময় দ্রুত বাজারে আনা যায়।

ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি এর আগে বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজারে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে এবং স্বর্ণ ব্যবহার করতে চাইলে সেটি লন্ডনে থাকা বিশেষভাবে সুবিধাজনক।

এই কারণেই DNB মনে করছে, সংকটের সময় নিউইয়র্ক বা অটোয়ার তুলনায় লন্ডনে রাখা স্বর্ণ দ্রুত ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমন কোনো দাবি করেনি যে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা কমে যাওয়ার কারণে তারা স্বর্ণ সরিয়েছে।

বরং DNB সরাসরি এই সিদ্ধান্তকে ‘বর্ধিত ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার’ মধ্যে সংকট প্রস্তুতি ও স্বর্ণের ব্যবহারযোগ্যতা বাড়ানোর পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।

তবে বাজার বিশ্লেষকদের কাছে সিদ্ধান্তটি তাৎপর্যপূর্ণ। Julius Baer-এর বিশ্লেষক কার্স্টেন মেনকে বলেছেন, সংকটের পরিস্থিতিতে লন্ডনে থাকা স্বর্ণ সাধারণত বেশি সহজে লেনদেনযোগ্য বলে DNB-এর ব্যাখ্যাটি বিশ্বাসযোগ্য।

তার মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন রিজার্ভের ক্ষেত্রে স্থিতিস্থাপকতা, কার্যকর প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন স্থানে সম্পদ ছড়িয়ে রাখার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

এত বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ সরানোর ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও পরিবহন ঝুঁকি রয়েছে। তাই DNB সরাসরি সব স্বর্ণ পরিবহন না করে বিক্রি-কেনা এবং শারীরিক স্থানান্তর—দুই পদ্ধতি ব্যবহার করেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এভাবে শারীরিকভাবে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ পরিবহনের ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

বিশেষ করে ২৭ টনের বেশি স্বর্ণ জেইস্টে এনে সেখান থেকে সমপরিমাণ মানসম্পন্ন স্বর্ণ লন্ডনে পাঠানোর ফলে একই স্বর্ণের বারকে পুনরায় গলানোর প্রয়োজন হয়নি।

নেদারল্যান্ডসের সিদ্ধান্তের কয়েক মাস আগে ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও নিউইয়র্কে থাকা স্বর্ণের একটি অংশ পুনর্বিন্যাস করেছিল।

২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে ব্যাংক অব ফ্রান্স নিউইয়র্কে থাকা প্রায় ১২৯ টন স্বর্ণ বিক্রি করে ইউরোপে নতুন স্বর্ণ কেনে। তবে ফ্রান্সের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটির ব্যাখ্যা ছিল মূলত স্বর্ণের মান ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যের বিষয়; এটিকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়নি।

এই দিক থেকে নেদারল্যান্ডসের সিদ্ধান্ত কিছুটা আলাদা—কারণ DNB স্পষ্টভাবেই ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতির কথা বলেছে।

তাৎক্ষণিকভাবে এই স্থানান্তরের কারণে বৈশ্বিক স্বর্ণবাজারে বড় কোনো সরবরাহ-ঘাটতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ নেদারল্যান্ডস তার মোট স্বর্ণের পরিমাণ কমায়নি; শুধু সংরক্ষণের স্থান পরিবর্তন করেছে।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় এর একটি প্রতীকী গুরুত্ব রয়েছে।

যদি ভবিষ্যতে আরও কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বর্ণের অবস্থান এমনভাবে পরিবর্তন করে যাতে তা দ্রুত বাজারে ব্যবহার করা যায়, তাহলে বৈশ্বিক রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় তারল্য, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি ও সম্পদের অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও কানাডার মধ্যে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তনের সময়ে এই ধরনের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বাজারের নজর কাড়তে পারে।

সূত্র: রয়টার্স

ChannelNRB Footer